হোম > নারী

ত্রিশ পেরিয়ে ছোট্ট মীনা

 শাকেরা তাসনীম ইরা, ঢাকা

রূপকথার রাজ্যের কোনো রাজকুমারী নয়, বাংলাদেশের গ্রামের সাধারণ মেয়ে মীনা। কোনো রাজার রানি হওয়ার স্বপ্ন তার নেই, নেই নায়িকা হওয়ার শখ। তার চেয়ে বরং নিজ গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ল্যাট্রিন বানানো, বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজনীয়তা, ইভ টিজিং বিষয়ে সতর্কতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা বন্ধ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সতর্কতা গড়ে তোলাতেই তার আগ্রহ বেশি।

ছোট্ট একটা গ্রামে বাবা, মা, ভাই, দাদি আর ছোট বোন রানিকে নিয়ে বসবাস করে মীনা। তার আবার আছে একটি পোষা পাখি, নাম মিঠু। সাধারণ বেশভূষা আর বাংলাদেশের গ্রামীণ গল্পের কারণে ৯০-এর দশকে এ দেশের জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড কার্টুন সিরিজ ছিল মীনা। বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছোট্ট মীনার ভূমিকা অনেক।

১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল—এই ১০ বছরকে জাতিসংঘ কন্যাশিশু দশক হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে শুরুতে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে সম্প্রচারিত হলেও পরে ২৯টি ভাষায় অনূদিত হয় মীনা সিরিজ। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় এর প্রথম পর্ব। খুব কম সময়ের মধ্যে মীনা চরিত্রটি এ দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৩টি পর্ব দিয়ে শুরু হলেও পরে এ সিরিজটির পর্বসংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টিতে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনমতে, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলের প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং গ্রামের ৮১ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী মীনাকে চেনে। জনপ্রিয় এই কার্টুন সিরিজের গল্প এবং ভাষা এতটাই সাবলীল ছিল যে মীনার সঙ্গে এ দেশের শিশু-কিশোরদের খুব দ্রুত সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে শিশুদের অভ্যাস গড়ে দিতে পারে এমন বিষয়গুলো সাবলীলভাবে তুলে ধরতে পারার কারণে মীনা চরিত্রটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কন্যাশিশুদের জীবনমান উন্নত ও নিরাপদ করার উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও মীনা কথা বলেছে শিশুশ্রম, ইন্টারনেটের সতর্ক ব্যবহার, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর শিশুখাদ্যসহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে। ৯০ দশকের জনপ্রিয় এই কার্টুন সিরিজ বহু বছর পরে এসেও আগের মতোই প্রাসঙ্গিক।

কন্যাশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশে ইউনিসেফের অর্জনগুলোর অন্যতম মীনা কার্টুন সিরিজটি। শুধু তা-ই নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াসহ আফ্রিকার ২৯টি দেশে মীনা চরিত্রটি ইউনিসেফের অন্যতম সফল পরিকল্পনা বলে বিবেচিত। বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হারসহ উন্নতির অন্য পরিমাপকগুলোর দিকে তাকালে এটি আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১০-২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েশিশুর ভর্তি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে ২০১০ সালে মেয়েশিশু ভর্তির সংখ্যা ছিল ৯১ লাখ ৫৮ হাজার ২১০ জন। এই সংখ্যা ছেলেশিশু ভর্তির সংখ্যার চেয়ে ৫০ হাজার বেশি। আর এই সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল প্রায় ৪ লাখ।

এ ছাড়া যৌথভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের করা মাল্টিপল ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯-এর তথ্যানুযায়ী, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, পয়োনিষ্কাশন, পরিচ্ছন্নতাবিধি, শিক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা-সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুর্দান্ত অগ্রগতি অর্জন করেছে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৩০ বছরে সব ধরনের শিশুমৃত্যুর হার নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এর পাশাপাশি গ্রাম ও শহরে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সংগ্রহের উৎসে উন্নতি সাধিত হয়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ জনগোষ্ঠীর নিজেদের বাড়িতে উন্নত খাওয়ার পানির উৎস রয়েছে। এ ছাড়া এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিবারে উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে। ৯০-এর দশকে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া অ্যানিমেটেড চরিত্র মীনা স্কুলে যেতে চাইত, লেখাপড়া করতে চাইত আর চাইত সবাইকে নিয়ে একটি আদর্শ গ্রাম গড়ে তুলতে। মীনার সেই আদর্শ গ্রামে কন্যাশিশুদের ঘরে বন্দী করে রাখা হতো না, বাল্যবিবাহের শিকার হতে হতো না। সবাইকে বিভিন্ন উপায়ে সচেতন করে কন্যাশিশুবান্ধব একটি আদর্শ গ্রাম তৈরি করাই ছিল মীনার উদ্দেশ্য।

এখন ইন্টারনেট ব্যবহার অনেক সহজলভ্য। অপেক্ষাকৃত উন্নত গ্রাফিকসসমৃদ্ধ অসংখ্য অ্যানিমেশন সিরিজ রয়েছে অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। তবে বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে মীনা। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সতর্কতা, সংক্রামক জীবাণু থেকে সুরক্ষিত থাকা, সংক্রমণ এড়াতে মাস্কের ব্যবহারসহ এ সময়ের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার চেষ্টা করছে মীনার সমসাময়িক পর্বগুলো।
তিন দশকের বেশি সময় আগে জন্ম নেওয়া মীনার বিপুল জনপ্রিয়তায় এখন কিছুটা ভাটা পড়েছে, এ কথা সত্য। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক পরিবর্তন সাধনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে মীনা নামক এই কার্টুন সিরিজ। ২০১২ সালে মীনার রেডিও শোতে প্রায় এক হাজার শিশুর ফোনকল এসেছিল।

২০১৬ সালে আসা মীনা গেম ডাউনলোড করেছে আট লাখের বেশি মানুষ। ১৯৯৩-২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান তাদের চলতি ফ্লাইটে মীনা কার্টুন দেখাত। এখনো বিলবোর্ড কিংবা দেয়াললিখনে জ্বলজ্বল করে মীনার ছবি। এর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় ১৯৯৮ সালে সার্কের পক্ষ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরকে মীনা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর মীনা দিবস পালন করা হয়।

শরিয়তি ফারায়েজ অনুযায়ী মেয়ের সন্তান নানার সম্পত্তির সরাসরি ওয়ারিশ হয় না

নিরাপত্তাহীন নারী ও শিশু, সংখ্যা বাড়ছে নির্যাতিতের

শেক্‌সপিয়ার বিশেষজ্ঞ ভয়ংকর এক নারী ইয়েং থিরিথ

ক্ষত আর স্বপ্ন নিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় নারীরা

বইকে বেঁচে থাকার শক্তি হিসেবে দেখাতে চান দিয়া

সৌন্দর্যশিল্পের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ আরডেন

বড়দিনের বিখ্যাত গানগুলোর নেপথ্যের নারীরা

উদ্যোক্তা মেলা: সংখ্যা কমলেও আশাবাদী নারী উদ্যোক্তারা

রোজের ফুটে ওঠার গল্প

আন্তর্জাতিক নারী: অন্ধকার আকাশ যাঁর ল্যাবরেটরি