মেক্সিকোতে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ। এ সংখ্যা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের দর্শকসংখ্যার চেয়ে বেশি! তবে মেক্সিকো সরকার এই বিষয়ে উদাসীন বলে দাবি করেছে দেশটির নিখোঁজ মানুষদের সন্ধানকারী নারী সংগঠনগুলো। তাই তারা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচকে কেন্দ্র করে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিকল্পনা করেছে।
সরকারি উদাসীনতার কারণে এই নারীরা নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলে নিজেরাই স্বজনদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। এর জন্য তারা প্রায়ই নানান নির্যাতন ও হুমকির শিকার হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানায়। পাশাপাশি ফিফা এবং অন্য দুই আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কঠোর অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মেক্সিকোর নির্বাহী পরিচালক ইডিথ অলিভারেস ফেরেতো বলেছেন, শুধু টিকিটের আকাশচুম্বী দামই মানুষকে এই বিশ্বকাপ পুরোপুরি উপভোগ করা থেকে দূরে রাখবে না। ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলোর ভক্ত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার আশ্বাস দিতে ব্যর্থতাও এর জন্য দায়ী। ফুটবল কখনো বিশ্বকে একত্র করতে পারে না, যখন গণনির্বাসন পরিবারগুলোকে ধ্বংস করছে এবং ভয় ও বিভাজন ছড়াচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ২৫ মে পর্যন্ত মেক্সিকোর জাতীয় রেজিস্টারে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৬০ জনে। মাদক কারবারি চক্রের সদস্যদের কারণে নিখোঁজ হওয়া কিংবা তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন হওয়া সন্তান, স্বামী বা ভাইদের স্মরণে এবং বিচারের দাবিতে মেক্সিকোর রাজধানীজুড়ে এক বিশাল পদযাত্রার আয়োজন করেছে এই নারী অনুসন্ধানকারী দলগুলো।
মেক্সিকোর স্বাধীনতার ইতিহাস ২০০ বছরের বেশি। দীর্ঘ এই যাত্রায় ২০২৪ সালে সেখানে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পান ক্লাউডিয়া শিনবাম পার্ডো। পেশাগত জীবনে তিনি একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও জলবায়ু প্রকৌশলী। এ কারণে মেক্সিকোতে এখন সরকারিভাবে শুরু হয়েছে ‘নারীদের যুগ’। ক্ষমতা গ্রহণের পর শিনবাম মেক্সিকান নারীদের সুরক্ষায় আইন ও বিচারব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনায় এ বছরের গোড়ার দিকে পাস হয় সাবস্ট্যান্টিভ ইকুয়ালিটি ডিক্রি। তিনি পুরোনো নারীবিষয়ক ইনস্টিটিউট বিলুপ্ত করে একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন ‘নারী মন্ত্রণালয়’ গঠন করেছেন। বিচারব্যবস্থা নারীবান্ধব করতে এই ডিক্রির অধীনে ভিকারিয়াস ভায়োলেন্স তথা সন্তান বা তৃতীয় পক্ষকে জিম্মি করে নারীকে মানসিকভাবে নির্যাতনের বিষয়ও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
নারী নির্যাতন ও ফেমিসাইড বা নারী হত্যা রোধে বিশেষায়িত জেন্ডার প্রসিকিউটর অফিস এবং তাৎক্ষণিক সুরক্ষা আদেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে মেক্সিকোতে। এমনকি পারিবারিক সহিংসতা ও ভরণপোষণের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতকে সপ্তাহের ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সচল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রম আইনেও এসেছে বড় বদল; কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ‘সমকাজের জন্য সম মজুরি’ নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষায় ৬০-৬৫ বছর বয়সী লাখ লাখ প্রবীণ নারীকে তাঁদের গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পেনশন বা ‘তারহেতা দেল বিয়েনেসতার’ দেওয়া হচ্ছে। ‘হেলথ কার্ড’ বিতরণের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে সর্বজনীন ও বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি আবাসন প্রকল্পগুলোতে একা থাকা নারী এবং সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মেক্সিকোর পার্লামেন্টে এখন ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে শিনবামের এই বিশাল আইনি জয়যাত্রার পরও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কার্টেল বা মাদক কারবারি চক্রের সহিংসতা এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন নারী হত্যার মতো গভীর জেন্ডারভিত্তিক ট্র্যাজেডি মেক্সিকোতে এখনো বিদ্যমান।
তবে শিনবামের এই ‘সাবস্ট্যান্টিভ ইকুয়ালিটি ডিক্রি’ মেক্সিকোর মিউনিসিপ্যালিটিগুলো এবং বিভিন্ন রাজ্যের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে।