কল্পবিজ্ঞান কিংবা জেনসনস কার্টুনের সেই উড়ন্ত গাড়ির দৃশ্যকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং বা ইলেকট্রিক এয়ার ট্যাক্সি। ধারণাটি ছিল চমৎকার। পরিবেশবান্ধব আকাশযানগুলো হেলিকপ্টারের মতো খাঁড়াভাবে ওঠানামা করবে আর মাত্র ১০ মিনিটে যাত্রীদের ম্যানহাটান থেকে জেএফকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেবে। কিন্তু বাস্তবে এই সাধারণ যাত্রীবাহী এয়ার ট্যাক্সির বাণিজ্যিকভাবে ডানা মেলতে যতটা সময় ও অর্থ লাগছে, তাতে ক্লান্ত হয়ে স্টার্টআপগুলো এখন নতুন এক গন্তব্য বেছে নিয়েছে। তাদের গন্তব্য এখন সামরিক খাত বা ডিফেন্স মার্কেট।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশন গত মার্চ মাসে ২৬টি অঙ্গরাজ্যজুড়ে ৮টি পাইলট প্রোগ্রাম অনুমোদন করেছে। জোবি অ্যাভিয়েশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি চার সিটের স্বায়ত্তশাসিত এয়ার ট্যাক্সি ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শেষ করেছে। এগুলোর উদ্দেশ্য ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক সামনে রেখে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা। চীনের গুয়াংজু ও শেনজেনে এরই মধ্যে এয়ার ট্যাক্সি চালুর পরও বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জন্য এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া মোটেই সহজ হচ্ছে না। এর মূল কারণ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি ছাড়পত্র বা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং আকাশচুম্বী উৎপাদন খরচ। ক্যানটর ফিটজেরাল্ডের জ্যেষ্ঠ বিনিয়োগ বিশ্লেষক আন্দ্রেস শেপার্ড জানান, লাইসেন্স জটিলতা এবং সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি হওয়ার কারণে গত এক বছরে বড় বড় এয়ার ট্যাক্সি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশের
বেশি পড়ে গেছে। এ কারণে অধৈর্য হয়ে পড়া বিনিয়োগকারীদের সামলাতে এবং ব্যালেন্সশিট শক্ত রাখতে বিকল্প পথ খুঁজছে এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
সাধারণ যাত্রীদের ট্যাক্সি সেবা দেওয়ার গতি ধীর হলেও ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই এয়ার ট্যাক্সি নির্মাতাদের সামনে এক বিশাল অর্থনৈতিক দরজা খুলে দিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এমন কিছু আকাশযানের চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা রানওয়ে ছাড়াই উঠতে পারে, প্রথাগত যুদ্ধবিমানের চেয়ে অনেক কম খরচে মোতায়েন করা যায়; একই সঙ্গে পণ্য সরবরাহ, নজরদারি এবং আহতদের মেডিকেল ইভাকুয়েশনের কাজ করতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ফার্নবরো এয়ার শোতে স্টার্টআপগুলোর নতুন রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর্চার অ্যাভিয়েশনের সিইও অ্যাডাম গোল্ডস্টেইন জানান, প্রতিরক্ষা খাতে বেসামরিক লাইসেন্সিংয়ের দীর্ঘসূত্রতা নেই এবং চুক্তির শেষে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। তারা অ্যান্ডুরিলের সঙ্গে মিলে সামরিক ও লজিস্টিকস মিশনে সক্ষম চালকবিহীন হাইব্রিড-ইলেকট্রিক বিমান উন্মোচন করেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভার্টিক্যাল অ্যাভিয়েশন তাদের ‘ভালো’ (Valo) বিমানের উড্ডয়ন সফলভাবে প্রদর্শন করলেও বাণিজ্যিক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রার সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সাল নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে বিটা টেকনোলজিস বেশ এগিয়ে রয়েছে। তারা শুরু থেকে বাণিজ্যিক মডেলের পাশাপাশি সামরিক ব্যবহারের জন্য একই মোটর ও পার্টস দিয়ে আলিয়া এমভি ২৫০ মডেল তৈরি করছে। বিটার সিইও কাইল ক্লার্কের মতে, দুটি সংস্করণের কাজ একসঙ্গে চালানো তাঁদের বাণিজ্যিক প্রোডাক্টের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের আঞ্চলিক এয়ারলাইনস লোগানএয়ার বিটার তৈরি বেসামরিক সিটিওএল বিমানের ১০টি অর্ডারও নিশ্চিত করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৭ অথবা ২০২৮ সালের মধ্যে হয়তো প্রথম নিবন্ধিত বেসামরিক ইলেকট্রিক বিমান আকাশে দেখা যাবে। কিন্তু আপাতত এই অ্যারোস্পেস কোম্পানিগুলোর বেঁচে থাকার এবং বিশাল অর্থ সংগ্রহের মূল জ্বালানি আসছে বিশ্বের প্রতিরক্ষা খাত থেকেই। আকাশে ওড়ার যে প্রযুক্তি মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত সহজ করার কথা ছিল, তা আপাতত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগেই সামরিক বাহিনীর শক্তিমত্তা বাড়ানোর জন্যই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স