প্রযুক্তি এত দ্রুত এগিয়ে চলছে, এখন অনেক আধুনিক গ্যাজেট দেখলে মনে হয় যেন সেগুলো সরাসরি কোনো কল্পবিজ্ঞান গল্প কিংবা সাইফাই মুভি থেকে এসেছে। এআই চালিত স্মার্ট চশমা থেকে শুরু করে স্বচ্ছ টেলিভিশন—ভবিষ্যতের এই ডিভাইসগুলো বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। এই উদ্ভাবনগুলো মানুষের যোগাযোগ, কাজ, পড়াশোনা এবং বিনোদনের পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে। এ ধরনের কয়েকটি গ্যাজেটের হদিস রইল এখানে।
এবার প্রযুক্তির পরবর্তী দিগন্ত সরাসরি আপনার চোখের মণিতে—সেটি হলো স্মার্ট কন্টাক্ট লেন্স। সম্প্রতি স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে দুবাইভিত্তিক টেক কোম্পানি এক্সপ্যান্সিও পাঁচটি কার্যকরী স্মার্ট কন্টাক্ট লেন্স প্রোটোটাইপ দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য তৈরি। চোখের মণিতেই থাকবে এআর ভিজ্যুয়াল এবং স্বাস্থ্য ট্র্যাকিং। কানে পরিধানযোগ্য ডিভাইস দিয়ে কন্টাক্ট লেন্সগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের দিকগুলো এক্সপ্যান্সিওর কন্টাক্ট লেন্সে অগ্রাধিকার পেয়েছে। এগুলো অশ্রু তরলের মাধ্যমে গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এ লেন্সে থাকবে মাইক্রো-ওএলইডি ডিসপ্লে। ভেতরে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোকেমিক্যাল সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে, যা চোখের জলের গ্লুকোজের মাত্রা শনাক্ত করে। ডায়বেটিসে আক্রান্ত ও বয়স্কদের জন্য কার্যকরী হতে পারে এটি।
স্মার্ট গ্লাস ধীরে ধীরে আরও উন্নত হচ্ছে। আগের স্মার্ট গ্লাসগুলো যেখানে শুধু নোটিফিকেশন দেখাত, সেখানে নতুন এআই চালিত এই চশমাগুলো রিয়েল-টাইমে ভাষা অনুবাদ, বস্তু শনাক্ত করা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং এআর নেভিগেশন ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের পথ দেখাতে পারে। মেটার রে-ব্যান স্মার্ট গ্লাস এবং গুগলের অ্যান্ড্রয়েড এক্সআর গ্লাসের মতো সর্বশেষ মডেলগুলো দেখতে সাধারণ সানগ্লাসের মতো হলেও এগুলোর ভেতরে রয়েছে ক্যামেরা, স্পিকার এবং পূর্ণাঙ্গ এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট। কোনো বিদেশি ভাষার মেনুর দিকে তাকালেই চোখের সামনে সঙ্গে সঙ্গে তার অনুবাদ ভেসে উঠবে। মেটা ও গুগল স্মার্ট গ্লাস নিয়ে পুরোদমে কাজ করছে। ভবিষ্যতে হয়তো স্মার্টফোন, স্মার্ট ওয়াচের জায়গা দখলে নেবে এআই স্মার্ট গ্লাস।
কোনো ডিভাইস দিয়ে রিয়েল-টাইম যেকোনো ভাষা অনুবাদ করে কারও সঙ্গে কথা বলা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। সেই প্রযুক্তি সত্যি হতে চলেছে। টাইমকেটল ডব্লিউ ৪ প্রো নামে একটি ইয়ারবাড রিয়েল-টাইম দ্বিমুখী অনুবাদক হিসেবে কাজ করবে। ইয়ারবাডটি তাদের নিজস্ব এআই ব্যবহার করে কয়েক ডজন ভাষায় প্রায় তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে দেবে। যেমন আপনি বাংলায় কথা বললেন, আপনার কথোপকথনের সঙ্গী তা ইংরেজিতে শুনতে পাবে। এই সবকিছুই ঘটে কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে, একটি ছোট ইয়ারবাডের মাধ্যমে। ইয়ারবাডটিতে ১২০ বিলিয়ন প্যারামিটারের একটি ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভিন্ন ভাষাভাষী দুজন ব্যক্তিকে সাবলীল ও স্বাভাবিক কথোপকথনে সাহায্য করে। এমন ডিভাইস নতুন মনে হলেও ভবিষ্যতে হয়তো আরও সহজলভ্য হবে।
এই অত্যাধুনিক ডিসপ্লেগুলো জানালা বা দেয়ালের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। শাওমি ও স্যামসাংয়ের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছ টিভি নিয়ে কাজ করছে। এসব টিভিতে একটি স্বচ্ছ ওএলইডি প্যানেলের আলো-উৎপাদনকারী প্রতিটি পিক্সেল ভীষণ সূক্ষ্ম। যখন টিভি বন্ধ থাকে বা ডিসপ্লে মোডে থাকে, তখন এর ভেতর দিয়ে সরাসরি দেখা যায়। এটি চালু করা হলে লাখ লাখ পিক্সেল আলোকিত হয়ে একটি ছবি তৈরি করে এবং পর্দার বিদ্যুৎবিহীন অংশগুলো স্বচ্ছই থেকে যায়। এলজি ইলেকট্রনিকসের মতো প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সিইএসের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি ইভেন্টগুলোতে স্বচ্ছ টিভি এবং ডিসপ্লে প্রদর্শন করেছে।
এক্সোস্কেলেটন হলো একটি পরিধানযোগ্য যান্ত্রিক কাঠামো। এটি বৈদ্যুতিক মোটর, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিধানকারীর স্বাভাবিক চলাচলে সহায়তা করে বা তার গতি বাড়িয়ে তোলে। এক্সোস্কেলেটন স্যুটে এমন সেন্সর থাকে, যা শরীরের নড়াচড়া শনাক্ত করে। এর ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র কম্পিউটারগুলো রিয়েল-টাইমে নড়াচড়া বিশ্লেষণ করে এবং ব্যবহারকারীকে সাহায্য করার জন্য মোটর সক্রিয় করে। কিছু উন্নত সিস্টেম এমনকি নড়াচড়ার ধরন অনুমান করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে। এই পরিধানযোগ্য রোবোটিক ডিভাইসগুলো একসময় শুধু কল্পবিজ্ঞান এবং শিল্প কারখানার গুদামেই সীমাবদ্ধ ছিল। এগুলো চিকিৎসা, সামরিক কাজ, কলকারখানার মতো জায়গায় ব্যবহার করা হয়। তবে এবার ভোক্তা পর্যায়ে স্মার্ট ওয়াচ, ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের মতো হয়ে উঠবে এক্সোস্কেলেটন স্যুটগুলো। সিইএস ২০২৬-এ বেশ কিছু স্যুট প্রদর্শিত হয়েছে। এগুলো হাইকিং, খেলাধুলা বা ব্যায়ামের মতো কাজে ব্যবহার করা যাবে।