কারও কারও কাছে তিনিই সর্বকালের সর্বসেরা ফুটবলার। বলা হচ্ছে ফুটবলের স্বর্গীয় প্রতিভা ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথা। অসাধারণ ফুটবলার হলেও তাঁর বেড়ে ওঠার গল্পটা তৃতীয় বিশ্বের হাজারো পোড় খাওয়া মানুষের মতোই।
‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ পরিবারে বেড়ে ওঠা যাঁদের, তাঁরা ঠিকই খেয়াল করেছেন, কঠিন অসুখেও মা ‘সব ঠিক আছে’র অভিনয় করেন। কিংবা পাতিলের সবটুকু খাবার ছেলের পাতে তুলে দেওয়ার জন্য অসুখের ভান করেন—‘শরীর ঠিক নেই, আমি কিছু খাব না’। দালমা ‘তোতা’ ফ্রাঙ্কোর অভিনয় ঠিকই বুঝতে পারতেন ম্যারাডোনা। ক্ষুধার্ত কোনো মানুষ দেখলেই শৈশবে ফিরে যেতেন ম্যারাডোনা, মনে পড়ত তাঁর মায়ের কথা। তাই তাঁর কাছে সাহায্য চেয়ে কখনই নিরাশ হতেন না অন্ন-বস্ত্রের কষ্টে থাকা মানুষেরা। কী আশ্চর্য, ম্যারাডোনা না থাকলেও তাঁর পৈতৃক ভিটা এখন অনাহারী মানুষের শেষ আশ্রয় স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে!
ম্যারাডোনার জন্মভিটা এখন রূপ নিয়েছে এক লঙ্গরখানায়। বুয়েনস এইরেসের শহরতলি ফিওরিতোর ৫২৩ আমাজোর স্ট্রিট, যেখানে ‘গোল্ডেন বয়’ খ্যাত ম্যারাডোনা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন, সেখানে এখন অভাবী মানুষজন খাবারের পাশাপাশি ভিড় করছেন পোশাকের জন্যও। ম্যারাডোনার শৈশবের ঘর থেকেই অভাবী মানুষের মুখে তুলে দেওয়া হচ্ছে খাবার।
আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই’র কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে সরকারি কর্মসংস্থান কমেছে। পরিবহন ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়ায় অনেক মানুষ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, সাধারণ মানুষের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা সংকটাপন্ন। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, আমদানি বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাওয়ায় ২০ হাজারেরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ম্যারাডোনার জন্মশহরেও। যা আয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। অসচ্ছল না খেয়ে থাকা মানুষদের সহায়তা দিতেই ম্যারাডোনার বাড়িতে খোলা হয়েছে লঙ্গরখানা। প্রতিবেশীদের কাছে ‘ডিয়েগোর বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত ম্যারাডোনার শৈশবের বাড়িতে অভাবী মানুষের আনাগোনা এখন লেগেই থাকে। স্বেচ্ছাসেবীরা বড় বড় হাঁড়িতে রান্না করা মুরগির ঝোল বা অন্যান্য খাবার ভরে দেন তাদের জন্য। স্পিকারে বাজতে থাকে মারাদোনার প্রিয় ‘কুম্বিয়া’ সংগীত।
অস্থায়ী এই লঙ্গরখানার সুবিধাভোগীদের একজন ডিয়েগো গাভিলান। কার্ডবোর্ড ও ধাতব বর্জ্য সংগ্রহ করেন এবং তা বিক্রি জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য। তাই এখন প্রায়ই ‘ডিয়েগো বাড়ি’তে আসেন খাবার নিতে। অসময়েই ম্যারাডোনাকে তিনি স্মরণ করেন এভাবে, ‘ডিয়েগো বেঁচে থাকলে বলতেন, চারদিকে অনেক ক্ষুধা। আমাদের সাহায্য করতে হবে; কারণ এখন মানুষের অভাব অনেক বেশি।’ম্যারাডোনার পুরোনো বাড়িতে সাহায্য পেয়ে খুশি গাভিলান। আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘শৈশবে তিনি এখানে অনেক ক্ষুধা সহ্য করেছেন। এই পাড়ার মানুষের জন্য তাঁর বাড়ি থেকে এক থালা খাবার পাওয়াটা খুবই বিশেষ কিছু।’
ডিয়েগো বাড়ির লঙ্গরখানায় বসে খাওয়ার জন্য কোনো টেবিল বা চেয়ার নেই। উঠানে খোলা আগুনের ওপর স্বেচ্ছাসেবীদের তৈরি করা খাবার ব্যাগে ভরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়।ম্যারাডোনা প্রায়ই তাঁর সাধারণ শৈশবের কথা বলতেন, যেখানে না ছিল পানির ব্যবস্থা, না ছিল পাকা রাস্তা। তাঁর জন্মের ৬৬ বছর পরও, খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে কষ্টের সুস্পষ্ট ছাপ। এই লঙ্গরখানারর অন্যতম রাঁধুনি মারিয়া তোরেস বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর পুরোনো বাড়িটি মহৎ কাজে ব্যবহৃত হতে দেখলে ম্যারাডোনা অত্যন্ত খুশি হতেন।
ফাদার লিওনার্দো তোরেস এই লঙ্গরখানা পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তি। তিনি ম্যারাডোনার বলা একটি গল্প স্মরণ করেন—কীভাবে তাঁর মা দালমা ‘তোতা’ ফ্রাঙ্কো নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াতেন। তিনি বলেন, ‘ডিয়েগো বলতেন যে তাঁর মা পেট ব্যথার ভান করতেন যাতে ডিয়েগো পেট ভরে খেতে পারেন।’ লিওনার্দো তোরেসদের ব্রত এখন একটাই, ‘‘আমরা চাই এখান থেকে অনেক ‘তোতা’ আর অনেক ‘ডিয়েগো’ যেন পেট ভরে খেয়ে তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন।’’
এএফপি অবলম্বনে