ফুটবল কখনো কখনো এমন কিছু গল্প লিখে, যা আগে থেকে কল্পনা করাও কঠিন। একটি ছবি, একটি সংখ্যা আর দুই প্রজন্মের দুই তারকা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক কাকতাল, যা বিস্মিত না করে পারে না।
আগামীকাল নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। মাঠের এক পাশে থাকবেন লিওনেল মেসি, আরেক পাশে লামিনে ইয়ামাল। একজনের ক্যারিয়ার প্রায় পূর্ণতার শেষ অধ্যায়ে, অন্যজনের পথচলা মাত্র শুরু। অথচ দুই ফুটবলারের গল্পকে অদ্ভুতভাবে জুড়ে দিয়েছে একটি সংখ্যা—১৯।
গল্পের শুরুটা ২০০৭ সালে। বার্সেলোনায় ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী মেসি। সেখানে প্লাস্টিকের একটি ছোট্ট নীল গামলায় পাঁচ মাসের এক শিশুকে গোসল করানোর ছবি তোলা হয়েছিল। সেই ছবি তোলার সময় কেউ ভাবেনি, শিশুটি একদিন ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হবে।
অনেক বছর পর ছবিটি প্রকাশ্যে আনেন ইয়ামালের বাবা। তখন জানা যায়, মেসির কোলে থাকা সেই শিশুই আজকের ইয়ামাল। ফুটবলের ইতিহাসে এমন কাকতাল খুব বেশি নেই। যে মানুষটি একদিন অবোধ এক শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন, ১৯ বছর পর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেই শিশুর বিপক্ষেই খেলতে নামবেন তিনি।
শুধু এই ছবি নয়, মেসি ও ইয়ামালের ক্যারিয়ারের শুরুতেও আছে বিস্ময়কর কিছু মিল। ২০০৬ বিশ্বকাপে মেসির অভিষেক হয়েছিল ১৮ বছর বয়সে। টুর্নামেন্ট চলাকালে তিনি পা রেখেছিলেন ১৯ বছরে। ঠিক ২০ বছর পর ইয়ামালের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা। এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে প্রথম খেলতে নামার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮। আর টুর্নামেন্ট চলাকালে ১৩ জুলাই তিনি পূর্ণ করেছেন ১৯ বছর।
মিল আছে জার্সি নম্বরেও। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে মেসি খেলেছিলেন ১৯ নম্বর জার্সি পরে। ইয়ামালও এই বিশ্বকাপে খেলছেন একই নম্বর নিয়ে।
বার্সেলোনার গল্পটিও যেন একই পথে হাঁটে। মূল দলে (প্রথমে ৩০) পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নেওয়ার পর মেসির প্রথম জার্সি নম্বর ছিল ১৯। কয়েক বছর পর সেটি রূপ নেয় ঐতিহাসিক ১০ নম্বরে। ইয়ামালের পথও প্রায় একই। বার্সার মূল দলে তাঁর শুরু ১৯ নম্বর জার্সিতে। নতুন মৌসুমে তিনিও পেয়েছেন সেই ১০ নম্বর, যেটি একসময় ছিল মেসির পরিচয়।
মাঠের বাইরেও দুজনের মধ্যে আরেকটি মিল রয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে ইউনিসেফের বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত মেসি ২০১০ সালে সংস্থাটির গ্লোবাল গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হন। চলতি বছর ইয়ামালও যুক্ত হয়েছেন ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে। প্রায় দুই দশক আগে যে সংস্থার একটি ফটোশুটে প্রথমবার একই ফ্রেমে এসেছিলেন দুজন, সেই সংস্থা আবার তাঁদের নামকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
এত কিছুর পর ১৯ সংখ্যাটিও যেন আলাদা করে চোখে পড়ে। প্রথম বিশ্বকাপে ১৯ বছর, ১৯ নম্বর জার্সি, বার্সেলোনায় ১৯ নম্বর থেকে শুরু, ইউনিসেফের সেই ছবি থেকে ১৯ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনাল, আর ফাইনালটিও ১৯ জুলাই।
অবশ্য ফুটবলে ট্রফি জেতা বা হারা কোনো সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য ঠিক হবে মাঠের লড়াইয়ে। তবু কিছু গল্প থাকে, যা ফলাফলের বাইরেও বেঁচে থাকে। মেসি ও ইয়ামালের গল্পটি তেমনই।
হয়তো ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুলবেন মেসি। হয়তো সেটি হবে ইয়ামালের প্রথম বিশ্বজয়ের দিন। কিন্তু যে ফলই হোক, এই ফাইনাল মনে থাকবে একটি ছবি, একটি সংখ্যা আর দুই প্রজন্মের দুই ফুটবলারের অদ্ভুত মিলের গল্প হিসেবে।