১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ‘বিশ্বকাপের দল' শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন, সেটি তুলে ধরার প্রয়াস। আজকের পর্বে উজবেকিস্তান
তিন দশক ধরে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর ব্যর্থতার গল্প লিখেছে উজবেকিস্তান। কখনো রেফারির ভুল সিদ্ধান্তে স্বপ্নভঙ্গ, কখনো টাইব্রেকারের স্নায়ুচাপে হার, আবার কখনো বিমান দুর্ঘটনায় এক প্রজন্মের ফুটবলারদের অকাল বিদায়—উজবেক ফুটবলের পরতে পরতে মিশে ছিল শুধু ট্র্যাজেডি। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে সেসব আক্ষেপের এপিটাফ লিখে ফেলেছে ‘হোয়াইট উলভরা’।
গত ৩১ মার্চ ফিফা সিরিজের প্রীতি ম্যাচে ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ৫-৪ গোলের পেনাল্টি শুটআউটে পাওয়া জয়টি হয়তো খুব বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না, তবে এটি ছিল উজবেকদের জন্য দলকে ঘরের মাঠে শেষবারের মতো অভিবাদন জানানোর সুযোগ। এই গ্রীষ্মে মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে তারা।
উজবেকিস্তানের এই ফুটবলীয় উত্থান শুধু মাঠের নৈপুণ্যের ফল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের এক গভীর প্রভাব। ২০১৬ সালে স্বৈরাচারী শাসনের ইতি টেনে নতুন পথের যাত্রা শুরু করে দেশটি, ফুটবল যেন তারই সার্থক প্রতিফলন। একসময়ের রহস্যময় আর কঠোর বিধিনিষেধের দেশটি এখন পর্যটন আর বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যেমন উন্মুক্ত, তেমনই ক্রীড়াঙ্গনেও তারা বিনিয়োগ করছে দুহাত খুলে। সরকারও উপলব্ধি করেছে, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য একটি দেশের ভাবমূর্তি বদলে দিতে পারে। গত কয়েক বছরে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মিনি ফুটবল মাঠ তৈরি এবং তৃণমূল পর্যায়ে অত্যাধুনিক সব একাডেমি গড়ে তোলা সেই নীরব বিপ্লবেরই অংশ। ফলে যুব পর্যায়ে উজবেকিস্তান এখন এশিয়ায় অপরাজেয় হয়ে উঠছে। তাদের অনূর্ধ্ব-১৭ দল ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছে এবং অনূর্ধ্ব-২০ দল ২০২৩ সালে এশিয়ান কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
আর্সেনালের সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার গত বছর বলেছিলেন, ‘উজবেকিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা যুব পর্যায়ে অসাধারণ কাজ করছে এবং যে অবকাঠামো তারা তৈরি করেছে তা অবিশ্বাস্য।’
ফুটবলের প্রতি এই নিবেদনই দেশটিকে উপহার দিয়েছে একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ। যারা বর্তমানে শুধু এশিয়ান পর্যায়েই নয়, বরং বৈশ্বিক ফুটবলেও নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিচ্ছে। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলা ২২ বছর বয়সী ডিফেন্ডার আব্দুকদির খুসানভ এই নতুন প্রজন্মের পোস্টার বয়।
বাছাইপর্বে গত বছরের জুনে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে রুখে দিয়ে উজবেকরা প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপে তারা শুধু সংখ্যা বাড়াতে যাচ্ছে না, বরং বুক চিতিয়ে লড়াই করতেই যাচ্ছে।
বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জ সামলাতে উজবেকিস্তান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও পিছপা হয়নি। বাছাইপর্বের সফল রূপকার তৈমুর কাপাদজেকে সরিয়ে কোচ হিসেবে তারা নিয়োগ দিয়েছে ইতালির হয়ে ২০০৬ বিশ্বকাপ জেতা অধিনায়ক ফাবিও কানাভারোকে। কিংবদন্তি এই ডিফেন্ডারের অভিজ্ঞতা আর কৌশল যেন দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কানাভারো তাঁর খেলোয়াড়দের মধ্যে যোদ্ধাদের মতো মানসিকতা দেখতে চান। প্রথমবার খেলতে এসে বিশ্বকাপে উজবেকিস্তেন ‘সি’ গ্রুপে পেয়েছে কলম্বিয়া, পর্তুগাল ও ডিআর কঙ্গোকে। তবু তাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
উজবেকিস্তানের মানুষের জন্য এই বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং জাতীয় আত্মপরিচয় বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক শ্রেষ্ঠ মঞ্চ। যে দেশটি একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়াতলে নিভৃতে দিন পার করত, এখন তাদের ফুটবলাররা ট্র্যাজেডির সেই ধূসর পাতাগুলো ছাপিয়ে লিখছে রঙিন মহাকাব্য।
কোচ
ফাবিও কানাভারো
তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার তিনি। ইতালিকে বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি জিতেছেন ব্যালন ডি’অরও। বাছাইপর্বের সফল রূপকার তৈমুর কাপাদজেকে সরিয়ে গত অক্টোবরে ইতালিয়ান কিংবদন্তি ফাবিও কানাভারোকে প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয় উজবেকিস্তান। বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়কের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে চমক দেখাতে চায় দেশটি। তবে কাপাদজে সহকারী কোচ হিসেবে কানাভারোর সঙ্গেই থাকছেন। ইতালিয়ান কৌশলের সঙ্গে কাপাদজের চেনা ঘরোয়া রসায়ন—এই দ্বৈত শক্তিতেই এখন উত্তর আমেরিকায় ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে উজবেকরা।
তারকা
আব্দুকদির খুসানোভ
উজবেকিস্তানের ফুটবল ইতিহাসে যে কয়জন খেলোয়াড় বৈশ্বিক ফুটবলে নিজেদের আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, আব্দুকদির খুসানভ তাঁদের মধ্যে অনন্য। মাত্র ২২ বছর বয়সেই লেস ও সিটির হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের অভিজ্ঞতা অর্জন করা এই তরুণ ডিফেন্ডারই এখন ‘হোয়াইট উলভ’দের বড় ভরসা। অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন খুসানভ। তাঁর নেতৃত্বেই ২০২৩ সালে উজবেকিস্তান অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের শিরোপা জয় করে।
উজবেকিস্তানের অবস্থা
র্যাঙ্কিং: ৫০
অঞ্চল: এশিয়া
ডাকনাম: হোয়াইট উলভস