কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি ও ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দির সংবাদ সম্মেলন শেষে বেলা ৪টায় ছুটতে হলো স্পোর্টিং কেসি ট্রেনিং সেন্টারে। সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হবে আর্জেন্টিনা দলের সংবাদ সম্মেলন। ১৫ মিনিট সুযোগ মিলবে আর্জেন্টিনা-দর্শনে। ঘড়ি ধরে সব কাজ, প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য অনেক। প্রতিটি সেকেন্ডকে তাই কাজে লাগানোর তাড়া।
সেই প্রতিটা সেকেন্ড কাজে লাগাতে হলে আবার যেতে হবে কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আর্জেন্টিনা দলের ১৫ মিনিটের ট্রেনিং সেশন দেখতে কতটা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হলো, সেটি বলা যাক আগে। কানসাস সিটি স্টেডিয়াম থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরের কেসি ট্রেনিং সেন্টারের প্রবেশমুখে ঢুকতেই পুলিশের বাধা। পুলিশ দেখিয়ে দিল, ট্রেনিং সেন্টারে ঢুকতে হলে কোথায় যেতে হবে। যেতে হলো আসলে একটা বাসস্টপেজে। বাসে ওঠার আগে নিরাপত্তা তল্লাশি।
বাস থেকে নেমে আবারও তল্লাশি। খানিকটা হাঁটা পথে অতঃপর শত শত সাংবাদিকের সঙ্গে আর্জেন্টিনা-দর্শন। ছবির মতো সুন্দর মাঠে কানসাসের এই মিষ্টি বিকেলে চোখের সামনে পুরো আর্জেন্টিনা দল। অনুশীলনের শুরুতে হালকা ওয়ার্মআপ, বল নিয়ে পায়ে হালকা নাড়াচাড়া—এতটুকু দৃশ্য দেখতেই এত ঘাম ঝরানো!
কিন্তু তিনি কোথায়? লিওনেল মেসি। ওই তো, ওয়ার্মআপ করছেন, বল নিয়ে হালকা কারিকুরিও। মেসিকে চোখের সামনে দেখলে পেশাদারি বর্ম খুলে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ অনুভব হবে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আসা যেকোনো সাংবাদিকের। খেলোয়াড়ের জীবনে যাঁর কোনো অপ্রাপ্তি নেই—বিশ্বকাপ জিতেছেন, কোপা আমেরিকা জিতেছেন আর ক্লাব ফুটবলে জেতা অসংখ্য ট্রফির গৌরবগাথা তো আছেই। তাঁর নামের পাশে বসে গেছে ‘গোট’ বা ‘গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ শব্দটা।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে একটা বৃত্ত পূরণের পথে ছিলেন মেসি। ২০০৬ সালের ১৬ জুন সার্বিয়া মন্টেনিগ্রো ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল ফুটবল জাদুকরের। ২০ বছর পর আরেকটা ‘১৬ জুনে (বাংলাদেশে অবশ্য ১৭ জুন পড়ে যাচ্ছে)’ মেসি যখন তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছেন, একটা বৃত্তই তাঁর পূরণ হবে। এই দুই দশকে আর্জেন্টিনাকে দুবার বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে শিরোপার খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছেন। কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপে ফুটবল বিধাতা তাঁকে আর ফেরাননি। ফুটবলের যুবরাজের গলায় পরিয়েছেন সাফল্যের মালা। আলজেরিয়ার ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচের ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ও হয়ে গেল মেসির। সাফল্যের ক্ষুধা সব চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়কেই তাড়া করে ফেরে। মেসিও চান বুকে তিনটির পাশে আরেকটি ‘স্টার’ যোগ করতে।
চোট কাটিয়ে ঝরঝরে চনমনে, নির্ভার মেসি যেন সংবাদমাধ্যম থেকেও নিজেকে একটু লুকিয়ে রাখতে চাইলেন। যেদিকে শত শত ক্যামেরা তাক করে আছে, সেদিকে পিঠ রেখে সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলনে মগ্ন। ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো যাবতীয় ‘অ্যাটেনশন’ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাইলেই কি আর ফেরা যায়! ঠিকই মিডিয়া খুঁজে নেয় তাঁকে। সে যতই তাঁর পাশে থাকুন নিকোলাস ওতামেন্দি, রদ্রিগো দি পল, নিকোলাস গনসালেস, লাউতারো মার্তিনেস, হুলিয়ান আলভারেসদের মতো তারকারা। মেসি হচ্ছেন সুপার স্টার, বাকিরা স্টার।
মেসির পাশাপাশি আরেকজন সবার আগ্রহের কেন্দ্রে থাকলেন—আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড স্কালোনি। দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে দলের যাবতীয় বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্কালোনি। কোচের ব্যাখ্যা শুনে একাধিকবার করতালি শোনা গেল সংবাদ সম্মেলনে। কঠিন কঠিন প্রশ্নের ভিড়ে কোচের ব্যাখ্যা কতটা মনঃপূত হলে সংবাদমাধ্যমকর্মীরা তালি দেন, ভাবুন। পরিচিত অনেক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিলেন বেশ রসিয়ে। সংবাদ সম্মেলন শেষে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ডায়াস থেকে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন একজনকে। ভদ্রলোকের নাম মার্টিনো পালের্মো। আর্জেন্টিনা দলের সাবেক স্ট্রাইকার, বোকা জুনিয়র্স কিংবদন্তি। বিশ্বকাপে এসেছেন লাতিন আমেরিকান টিভি ডি-স্পোর্টসের হয়ে।
স্কালোনি আর পালের্মো একসঙ্গেই জাতীয় দলে খেলেছেন। পালের্মোকে সংবাদ সম্মেলনে দেখে বেশ অবাক স্কালোনি। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম আছে পালের্মোর। না গোল করে নয়, গোল মিস করে! ১৯৯৯ কোপা আমেরিকায় গ্রুপপর্বে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে টানা তিনটি পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা, তিনটিই নিয়েছিলেন পালের্মো, একটাতেও গোল করতে পারেননি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পেনাল্টি মিসের হ্যাটট্রিক ওই একটিই! সাবেক সতীর্থ পালের্মোকে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থকে বিদায় নেওয়ার আগে জড়িয়ে ধরলেন স্কালোনি।
বিশ্বকাপে এ রকম হৃদয়ছোঁয়া আরও অনেক দৃশ্য উপহার দিতে চায় পুরো আর্জেন্টিনা দল।