চার বছর আগে কাতার যখন ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখন গোটা বিশ্বের চোখ ছিল তাদের দিকে। কিন্তু সেই দৃষ্টি গর্বের ছিল না, ছিল করুণার। ইকুয়েডর, সেনেগাল, নেদারল্যান্ডস — তিন ম্যাচে তিনটি হার। পয়েন্ট তো দূরের কথা একটি গোলও কপালে জোটেনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিক দেশ হিসেবে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ হেরে বিদায় নেওয়ার লজ্জাজনক রেকর্ড সেদিন থেকে কাতারের নামের পাশে আটকে গিয়েছিল। সেই ক্ষতটা শুকাতে লেগেছে পুরো চার বছর।
২০২৬ বিশ্বকাপে কাতার এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। এবার আর স্বাগতিকের সুবাদে সরাসরি টিকিট নয় । বাছাইপর্বে মাঠে নেমে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্লে-অফে হারিয়ে নিজেদের যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছে তারা। এই পার্থক্যটা ছোট নয়। এটা একটা দলের মানসিক বদলের গল্প।
প্রথম ম্যাচে শনিবার তাদের প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী সুইজারল্যান্ড। ম্যাচ যখন শেষের দিকে গড়াচ্ছে, তখনও ফলাফল কাতারের পক্ষে নয়। গ্যালারিতে উদ্বেগ, মাঠে চাপ। কিন্তু ঠিক যোগ করা সময়ে মাঠের এক কোণ থেকে এগিয়ে এলেন ৩৫ বছর বয়সী ডিফেন্ডার বুয়ালেম খুখি। বুলেট হেডে বলটা জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ১-১ করলেন তিনি। আর সেই এক গোলেই কাতার পেল তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট। যার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ চার বছর।
খুখির নিজের গল্পটাও কম আঁকাবাঁকা নয়। জন্ম আলজেরিয়ার ছোট্ট শহর বু ইসমাইলে। ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল দেশের ক্লাব জেএসএম চেরাঘায়, উইঙ্গার হিসেবে। দুই পায়ে গতি নিয়ে মাঠ কাঁপানো সেই ছেলেটি কখনো ভাবেননি হয়তো, একদিন তিনি হবেন ডিফেন্ডার। কিন্তু তরুণ বয়সে কাতারে পাড়ি জমালেন, নিলেন সেই দেশের নাগরিকত্ব। এরপর কোচের কৌশল আর দলের প্রয়োজনে পজিশন বদলাতে বদলাতে মিডফিল্ডার হয়ে, শেষ পর্যন্ত থিতু হলেন সেন্টারব্যাক হিসেবে।
অদ্ভুত হলেও সত্যি — মাঠের একদম পেছনে সরে এলেও গোলের নেশাটা কখনো ছাড়েননি। কাতারের হয়ে একশোরও বেশি ম্যাচ খেলে তাঁর আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা এখন ২২, যা একজন ডিফেন্ডারের জন্য সত্যিই বিরল।
কাতারি ফুটবলের ভালো সময়গুলোতেও খুখি ছিলেন। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে টানা দুটি এশিয়ান কাপ জয়ে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ। কিন্তু ২০২২ বিশ্বকাপের সেই ব্যর্থতা তাঁকেও স্পর্শ করেছিল গভীরভাবে, কারণ সেই দলের তিনিও ছিলেন একজন। সেই বেদনা বুকে নিয়েই হয়তো মাঠে নেমেছিলেন এবার।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে যোগ করা সময়ের গোলটি তাই নিছক একটি পয়েন্টের হিসাব নয়। একটি দলের পুরনো গ্লানি থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্ত, একটি জাতির ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আর সেই মুহূর্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন আলজেরিয়ার এক ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা এক খুখি, যিনি কাতারি ফুটবলকে নিজের করে নিয়েছিলেন বহু আগেই। বোয়ালেম খুখির এই গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের নয়, বরং কাতারের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও বটে।