মিসৌরি নদীর তীরে নিরিবিলি, ছিমছাম বার্কলি রিভারফ্রন্ট এলাকায় রোববার বিকেলে যেতেই বুঝতে অসুবিধা হলো না এটাই আর্জেন্টিনা দলের ঘাঁটি। টিম হোটেলের পেছনের দিকটায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার ছবিসংবলিত বিশাল পতাকা ঝুলিয়ে দিয়েছে আর্জেন্টাইনরা। তাঁরা ড্রাম বাজাচ্ছেন, উল্লাস করছেন। কোরাস তুলছেন, ‘ওলে, ওলে...ভামোস আর্হেন্তিনা!’
পরিবেশটাই অন্য রকম। এক দল ক্যারাভ্যান বা মোটরহোম ভাড়া করেছে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ঘুরে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখবে বলে। গাড়ির চালক রোমেরো জানালেন, তাঁরা সাতজনের একটা দল ভাড়া করেছেন গাড়িটা। মোটরহোমে যা যা থাকার সবই আছে—ঘুমানো, বসার জায়গা তো আছেই। ছোট্ট রান্নাঘর, ফ্রিজ, জিনিসপত্র নিয়ে তাঁরা ছুটছেন এ শহর থেকে ও শহর।
রোববার বিকেলে আর্জেন্টিনা দলের অনুশীলনে যাওয়া ও আসার সময়ে টিম হোটেলের সামনে জড়ো হওয়া আর্জেন্টাইনদের যে-ই শুনছেন বাংলাদেশ থেকে আগত—কী যে খুশি হন তাঁরা। খুব কাছের মানুষের মতো জড়িয়ে ধরেন, উৎফুল্ল মনে জানতে চান বাংলাদেশ সম্পর্কে। বাংলাদেশকে তাঁরা পছন্দ করেন, এত দিন দূর থেকে শুনে এসেছি। প্রথমবার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো আর্জেন্টাইনরা বাংলাদেশকে আসলে কতটা ভালোবাসেন। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁদের বিপুল আগ্রহ। বাংলাদেশিদের তাঁরা বারবার বলতে চান, ‘গ্রাসিয়াস (ধন্যবাদ) বাংলাদেশ!’
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকর্মী শুনে আর্জেন্টিনার সাংবাদিকেরা সাক্ষাৎকার নিতে চান। নিজেদের দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চান বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার খবর। দুই দেশের এই আত্মিক বন্ধনটা তৈরি করেছে ফুটবল। ছিয়াশির বিশ্বকাপের পর ডিয়েগো ম্যারাডোনার সৌজন্যে সুদূর বঙ্গীয় বদ্বীপে যে আর্জেন্টিনার বিশাল ফ্যানবেস তৈরি হয়েছিল, সেটি পরে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন এই যুগের ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।
চারদিকে এত ঘেরাটোপ, বাইরে থেকে মেসিদের হোটেলের কোনো কিছুই দেখা সম্ভব নয়। তবু টিম হোটেল আর আর্জেন্টিনা দলের অনুশীলনে যাওয়া-আসার সময়ে টিম বাস দেখতে হাজারো ভক্ত-সমর্থকদের ভিড় লেগেই থাকছে। টিম হোটেলের সামনের দিকে টানানো হয়েছে মেসির ছবিসংবলিত দুটি বিশাল ব্যানার। তাতে লেখা, ‘তুমি এটা পেয়েছ’। ২০২২ বিশ্বকাপ জিতে পূর্ণতা পেয়েছে মেসির বর্ণিল সাফল্যভাস্বর ক্যারিয়ারটা। সেটাই যেন তুলে ধরা আর্জেন্টিনার টিম হোটেলে। একজন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে পুরো দলের মিশন—আর্জেন্টিনা দলেই বোধ হয় ছবিটা বড় ক্যানভাসে দেখা যায়। মেসি নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, এটি স্বাভাবিক দৃশ্য মনে হয় আর্জেন্টাইনদের কাছেও। কাতার বিশ্বকাপে মেসির রুম নম্বর ছিল ‘২০১’—২+১ মিলিয়ে ‘৩’ নম্বর বিশ্বকাপ হয়েছে আর্জেন্টিনার। এবারের তাঁর রুম নম্বর ‘২০২’—তাহলে কি ২+২ = ৪? আগামী ১৯ জুলাইয়ের পর জার্সিতে কি বসবে চারটা তারকা? সংখ্যাতাত্ত্বিক জ্যোতির্বিদ্যায় ভরসা নয়, মেসিরা চান একটা দল হয়ে খেলতে। তাঁর কক্ষের বিছানার পেছনে তাই লেখা, ‘তোদোস জুন্তোস’ মানে, ‘সবাই একসঙ্গে’। বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়তে যে খেলতে হয় একটা দল হয়েই।
আর্জেন্টাইনদের কাছে মেসি ‘গোট’ আর দিয়েগো? ‘গড’। দুজনকেই তাঁরা সমান গুরুত্ব দিতে চান। আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে আর্জেন্টাইনদের এবারও স্বপ্ন বড়। গত পরশু আর্জেন্টিনা টিম হোটেলের সামনে যত আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলা হলো যে কোন দুটো দল খেলবে ফাইনাল? ঝটপট উত্তর, ‘আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ফাইনাল আর শিরোপা জিতবে আর্জেন্টিনা’! চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে শিরোপা জয়ের নিখাত আনন্দে ভাসতে চান তাঁরা। আর সেই উৎসবে নেচে উঠতে তাঁরা আহ্বান জানান বাংলাদেশের বিপুল আকাশি-নীল সমর্থকদেরও।