২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল—দেড় বছরের বেশি সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) দেখে ফেলেছে তিনজন সভাপতি। সবার আগমন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তাঁদের বিদায়ও তেমন করুণ আর বিবর্ণ। নাজমুল হাসান পাপন, ফারুক আহমেদ, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের পর দৃশ্যপটে এখন তামিম ইকবাল। ক্ষমতার জোরে গঠনতন্ত্র কিংবা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সংস্কৃতি নতুন কিছু নয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে। তামিম সে পথ ধরেই বসলেন বিসিবি-প্রধানের চেয়ারে।
২০১২ সালের অক্টোবরে বিসিবি সভাপতি হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়াদ শেষে নাজমুল হাসান পাপনকে অ্যাডহক কমিটির প্রধান করে বিসিবির প্রধান করেছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাঁর মূল কাজ ছিল বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন আয়োজন করা। এক বছর ‘বিসিবির বস’ হিসেবে যে ‘মজা’টা পেয়ে গেলেন পাপন, সেটি আর ছাড়তে চাননি। চেয়ার ধরে রাখার স্বার্থে দুবার নিজেদের মতো গঠনতন্ত্র কাটাছেঁড়া করলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ক্রীড়ামন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পরও বিসিবি সভাপতির পদটা আঁকড়ে ধরে রাখলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাপনদের এক যুগের রাজত্বের অবসান। এরপর শুরু ক্রিকেট প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের বিশৃঙ্খল এক চিত্র। ফারুক বিসিবির সভাপতি হওয়ায় তাঁর অতীতের ভাবমূর্তি ও ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞায় দেশের ক্রিকেটে অনেকে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই ভিন্ন ছবি। ক্রিকেট রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ আর নিজের কিছু ভুলে ফারুক টিকতে পারলেন সাকল্যে ৯ মাস। তাঁর অপসারণের প্রক্রিয়াটা এতটাই দৃষ্টিকটু ছিল, দৃশ্যপটে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও ক্ষুরধার ক্রিকেট-মস্তিষ্ক আসার পরও সংশয় দূর হয়নি।
গত বছরের ৩০ মে এনএসসি মনোনীত হয়ে আইসিসির চাকরি ছেড়ে বিসিবির সভাপতি হয়েছিলেন বুলবুল। একটি মনে রাখার মতো টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলার লক্ষ্যে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনে এসে পরে নানা রাজনৈতিক হিসাবের মারপ্যাঁচে বুলবুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ‘টেস্ট ইনিংস’ খেলবেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের আগুনে বাউন্সার আর অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার বুলবুল ‘টেস্ট ইনিংস’টা বেশি লম্বা করতে পারেননি। তাঁর সাদা পোশাকে কাদা লাগতে বা লাগিয়ে দিতে সময় লাগেনি।
গত অক্টোবরে বুলবুলের সঙ্গে তামিমের বিসিবি সভাপতি হওয়ার পদে লড়াই হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। পরে সমঝোতার কথাও জানা গিয়েছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে সরকার ভেঙে দিল বুলবুলের পরিচালনা পর্ষদ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং বর্তমান অস্থিতিশীলতা কাটাতে বুলবুল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। বুলবুল জানিয়ে দিয়েছেন, উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত কোনো রায় না আসা পর্যন্ত তিনিই বিসিবির বৈধ সভাপতি হিসেবে বহাল আছেন।
ফুটবল ও ক্রিকেটের বৈশ্বিক অভিভাবক সংস্থা কখনোই সদস্যদেশগুলোর বোর্ড বা ফেডারেশনে সরকারি হস্তক্ষেপ অনুমোদন করে না। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময়েই এ কারণে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা। ২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কাকে নিষিদ্ধ করেছিল আইসিসি। এবার আইসিসি কি বিসিবির বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ নেবে? সেটা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহর সবুজসংকেত না পেলে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এত দ্রুত এই ঝুঁকি নেওয়ার কথা নয়। বিসিবির নতুন অ্যাডহক কমিটি নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রজ্ঞাপন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এই কমিটির অনুমোদন আছে কি না, আইসিসির সেই বার্তা পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী গতকালও মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন। তামিম টানা দুটি সংবাদ সম্মেলনে তেমন প্রশ্ন নেননি।
ক্ষমতার অপব্যবহারের এমন দৃশ্যে সামাজিক মাধ্যমে যতই তুমুল সমালোচনার ঝড় বইয়ে যাক, যতই সংসদ অধিবেশনে বিসিবিকে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ তকমা দেওয়া হোক না কেন, যাঁরা এ মুহূর্তে ক্রিকেট প্রশাসনে গদিনশিন, তাতে তাঁদের থোড়াই কেয়ার! হয়তো ক্ষমতার গরমে এখন থোড়াই কেয়ার, কিন্তু যখন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া হয় না, কিংবদন্তিতুল্য ক্রিকেটারদের বিদায়টা করুণই হয়। আর বারবার এসব যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্য দেখে নিখাদ ক্রিকেটপ্রেমীদের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তাঁদের প্রশ্ন জাগে, ‘আহ্, চেয়ারটার মোহে কেন এই কিংবদন্তিরা নিজেদের এভাবে বিসর্জন দেন!’