২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচন এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মূল অভিযোগ হলো, পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করছে যা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-কে দেওয়ার সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেন মাহফুজ।
কেন নির্বাচনে লড়ছেন না বা এনসিপিতে যোগ দেননি, সেই প্রশ্নে মাহফুজ আলম জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার জোটটি কোনো সঠিক বোঝাপড়া ছাড়াই গঠিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, তিনি কোনো দলের হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন না কারণ এখন তার জন্য সঠিক সময় নয়।
জামায়াতে ইসলামীকে আওয়ামী লীগের ‘অল্টার ইগো’ বা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখেন মাহফুজ আলম। তাঁর মতে, একটি থাকলে অন্যটি থাকবেই, তাই তাদের মধ্যে মৌলিক কোনো পরিবর্তন না এলে তাদের গ্রহণ করা কঠিন।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে পুরোনো ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে জোট করা সম্ভব নয়, কারণ জামায়াতের অনেক বিষয়ে কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য নেই। বলেন মাহফুজ আলম।
তিনি গত দেড় বছরের যাত্রাকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং স্বপ্নের অপমৃত্যু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, জুলাই আন্দোলনের তরুণ শক্তিগুলোকে নিয়ে একটি ‘তৃতীয় বিকল্প’ বা সাধারণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। তিনি মনে করেন, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং তাদের কৃতিত্বকে খাটো করার চেষ্টা চলছে।
মাহফুজ আলম জোর দিয়ে বলেছেন, শুধু কাগজের কলমে বা আইনি সংশোধনের মাধ্যমে সমাজসংস্কার সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই প্রয়োজন যাতে ফ্যাসিবাদের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা যায়।
মাহফুজ আলম বলেন, গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার যে ক্ষোভ মানুষের মধ্যে ছিল, তা ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন রূপে বেরিয়ে এসেছে। একে সঠিক গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করতে হবে। তিনি একে বিপ্লবের চেয়ে ‘অসমাপ্ত আলোচনা’ হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন।
বর্তমানে মাহফুজ আলম সাধারণ মানুষ এবং হতাশ তরুণদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগামীর রূপরেখা তৈরি করতে চান। তাঁর মতে, একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে: সংখ্যালঘু, বিভিন্ন শ্রেণি এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে পুনর্মিলন জরুরি।
মাহফুজ বলেন, গণমাধ্যমকে তাদের অতীতের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া বা জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে, কারণ বর্তমানে সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমকে আস্থায় নিতে পারছে না। যদি এই সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধান না করা হয়, তবে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স চলতেই থাকবে।
মাহফুজ আলম মনে করেন, এই সংগ্রাম তরুণদের মধ্যে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে চলতেই থাকবে যতক্ষণ না একটি প্রকৃত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সাধিত হয়।