নির্বাচনী ইশতেহার
রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে দলের ঘোষিত ৩১ দফা, জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করছে বিএনপি। ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান, প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই ইশতেহারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন বক্তব্যের মূল দিকনির্দেশনাও প্রতিফলিত হবে। এর মধ্যে তাঁর ঘোষিত ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের আদলে বাংলাদেশে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকারও ইশতেহারে স্থান পাচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম ও ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইশতেহার তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখন ইশতেহারের খসড়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ইশতেহার প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়ায় সংযোজন-বিয়োজন করছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই দলের স্থায়ী কমিটি ইশতেহার চূড়ান্ত করবে এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীর সামনে তা তুলে ধরা হবে। প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ ও নির্বাচনী প্রচার শুরুর দুই-এক দিন আগে বা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।
জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দলের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ মোটামুটি শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগেই চূড়ান্ত করে আমরা এটা ঘোষণা করতে পারব বলে আশা করছি।’
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা, ‘ভিশন ২০৩০’, জুলাই জাতীয় সনদ, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নির্ধারিত ৮টি বিশেষ খাত। ৩১ দফার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ইশতেহার তৈরির কাজ শেষের দিকে। তবে কবে নাগাদ জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে, সেই দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার প্রায় পৌনে ১৩ কোটি। এর মধ্যে দেড় কোটির বেশি নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই তরুণ ভোটাররাই এবারের নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
দীর্ঘদিন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাশাপাশি ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে তরুণ সমাজের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ ও উদ্দীপনা বেড়েছে। বিএনপির সূত্র বলেছে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ ভোটারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ৬ কোটির বেশি নারী ভোটারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র বলেছে, ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া জনকল্যাণমুখী ৮ খাতের মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানী। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি পাবেন। এ ছাড়া শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্ব দেবে বিএনপি। ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সব স্তরে খেলাধুলার উন্নয়নেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরিবেশ রক্ষায় নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং কার্যক্রম জোরদার করা হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এসএমই, ব্লু ইকোনমি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইসিটি, ই-কমার্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, গেমিং ও স্টার্টআপ খাতকে প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত ও পাদ্রিদের জন্য মাসিক সম্মানী দেওয়ার বিষয়টিও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি এ বিষয়কে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাজ্যের আদলে বাংলাদেশে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘মূলত বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা ও সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০২৩’-এর আলোকে দলের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সেগুলো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।’