হোম > রাজনীতি

ইসলামপন্থী রাজনীতিতে মেরুকরণ: ভোটের সমীকরণে কে এগিয়ে গেল

জাহাঙ্গীর আলম

জামায়াতে ইসলামীর জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণার পর মিষ্টি বিতরণ করেন ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। ছবি: স্ক্রিনশট

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাসে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ বা ‘এক বাক্সে ভোট’ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই সম্ভাবনা তুঙ্গে উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা চরম নাটকীয়তায় পর্যবসিত হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় ইসলামপন্থীদের শক্তি এখন তিনটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত। এই বিভাজন কেবল আসনকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার এক অদৃশ্য যুদ্ধের ফল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ ভেঙে যাওয়ায় নির্বাচনী মাঠ এখন তিনটি ভিন্ন মেরুতে বিভক্ত:

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ‘১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’: জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এই মোর্চায় রয়েছে পাঁচটি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ইসলামি দল। এর বাইরে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির নেতাদের গঠিত এনসিপিকে যুক্ত করা জামায়াতের জন্য একটি বড় কৌশলগত বিজয় বলা যেতে পারে। এটি তাদের ওপর লেগে থাকা ‘মৌলবাদী’ তকমা ঘোচাতে সাহায্য করছে। তারা ইসলামপন্থীদের, বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের একাংশের ভোট টানতে মামুনুল হকের দলসহ কয়েকটি ইসলামি দলকে নিয়েছে। আবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে এনসিপিকেও রেখেছে। আবার সেক্যুলার দলও রেখেছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) : ২৬৮ আসনে একক প্রার্থী এবং ৩২টি আসনে কৌশলী সমর্থনের মাধ্যমে তারা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামি শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া। তাদের লক্ষ্য জামায়াতের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বতন্ত্র ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া।

বিএনপি-ঘেঁষা ইসলামি জোট: জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ তিনটি দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যুক্ত হয়েছে। এবারের গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করা এই দলগুলো কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটব্যাংকে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারে।

৫ আগস্টের পর ইসলামপন্থী দলগুলোকে নিয়ে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম গড়ার উদ্যোগ নেয় জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে তারা সমমনা সব দলের প্রতিনিধিকে নিয়ে বৈঠকও করেছে। যদিও কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একাধিক দল দ্রুতই জামায়াতের সঙ্গে তাদের আদর্শগত পার্থক্যের কথা জোরেশোরে বলেছে। তারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করাই তাদের জন্য উপযুক্ত বলে বেছে নিয়েছে।

এরপরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দল জামায়াতের সঙ্গে থেকে গেছে। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জোট প্রায় পাকাপোক্তই ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যুক্ত হওয়ার পর থেকেই টানাপোড়েন শুরু হয়। ইসলামী আন্দোলন বারবার তাদের অবহেলা ও উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তাদের বিচ্ছেদের মূল কারণ হিসেবে কেবল ‘আসন ভাগাভাগি’কে দেখা হলেও এর গভীরে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও। যেমন:

আসনকেন্দ্রিক ইগো: ইসলামী আন্দোলনের দাবি ছিল ৮০টি আসন, যেখানে জামায়াত তাদের কনিষ্ঠ শরিক হিসেবে গণ্য করে ৩০-৩৫টির বেশি দিতে রাজি ছিল না। যদিও পরে জামায়াত ৪৫টি আসন পর্যন্ত ছাড় দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে আস্থার সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

আদর্শিক ও কৌশলগত ফাটল: ইসলামী আন্দোলন অভিযোগ তুলেছে, জামায়াত নির্বাচনের আগেই বিএনপির সঙ্গে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের গোপন সমঝোতা করেছে। তাদের আশঙ্কা, এই নির্বাচন হবে একটি ‘সিলেকশন’ বা পাতানো খেলা। অন্যদিকে জামায়াতের সন্দেহ ছিল—ইসলামী আন্দোলন অন্য কোনো মহলের ইশারায় ঐক্য ভাঙার চেষ্টা করছে কি না। এ ছাড়া বিভিন্ন ফোরামে জামায়াত স্পষ্ট করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে ইসলামি শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে না। নারী অধিকারের বিষয়েও তারা জোরালো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে বরাবরই আপত্তি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন।

উপেক্ষা ও অসম্মানের অভিযোগ: ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে জামায়াত কর্তৃক জোটের আসন ঘোষণা করাকে ‘চরম অপমান’ হিসেবে দেখছে চরমোনাই পীরের দল। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের ভাষায়, ‘নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নে আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি।’

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রায় সবগুলো বিতর্কিত নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন অংশগ্রহণ করেছে। সর্বশেষ বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সহিংসতারও শিকার হয়েছে তারা। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর চরমোনাই পীরের দরবারে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের ধরনা দেওয়ার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে তাদের নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবারও যৌক্তিক কারণ রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোর কোনোটিতেই ৩ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এখন তাঁরা একটি প্রকৃত ইসলামপন্থী রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে চান। তাঁদের ভাষায়, ইসলামপন্থা থেকে ‘বিচ্যুত’ জামায়াতের বিপরীতে বাকিদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তাঁরা করবেন।

তবে রাজনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই ত্রিভুজাকার বিভাজন ইসলামি দলগুলোর ভোট পাওয়ার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর মধ্যে জামায়াতবিরোধী আলেমদের একটি বড় অংশ (বিশেষ করে হেফাজতে ইসলাম) জামায়াতকে ঠেকাতে সক্রিয় হতে পারে। এই অবস্থায় কওমি ভোটের একটি অংশ ধরে রাখতে মাওলানা মামুনুল হক ও তাঁর দল ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস’ জামায়াতের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে। মামুনুল হকের ব্যক্তিগত ইমেজ কওমি মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ইসলামপন্থীদের ভোট তিনটি আলাদা বাক্সে পড়লে তার সরাসরি সুবিধা পাবে বিএনপি বা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। বিশেষ করে যে আসনগুলোতে ইসলামি দলগুলোর সম্মিলিত ভোট জয়ের নির্ণায়ক ছিল, সেখানে আলাদা প্রার্থী থাকায় তারা আসনবঞ্চিত হতে পারে।

বিএনপির সঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সমঝোতা জামায়াতের একক প্রভাবকে খর্ব করবে। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো এলাকাগুলোতে এই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই বিভক্তি নির্বাচনী রাজনীতিতে সব পক্ষের জন্যই একটি বড় ধাক্কা। দীর্ঘদিন ধরে জোটের আওয়াজ তুলে শেষ মুহূর্তে এই বিভক্তি ইসলামপন্থী রাজনীতির ভেতরের বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নেশায় ইসলামি দলগুলো তাদের সম্মিলিত শক্তিকে বরং হীনবলই করল।

২০২৬-এর নির্বাচন সামনে রেখে এই বিভাজন প্রমাণ করল, বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো এখনো একটি সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ। জামায়াতের সুসংগঠিত মোর্চা বনাম ইসলামী আন্দোলনের একক শক্তিমত্তার এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কার জন্য সুবিধাজনক হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে।

লেখক: সাংবাদিক

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দূর করতে না পারলে সাংবাদিকদের এক হওয়া সম্ভব নয়: বিজেসি সভাপতি

নির্বাচনী সফরে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছেন জামায়াত আমির

বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে মাহমুদুর রহমান মান্না

নাগরিক শোকসভা: বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন দেশের নেত্রী

জামায়াতের জোট ছাড়ল ইসলামী আন্দোলন

ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়বে, প্রত্যাশা করিনি: আসিফ মাহমুদ

পোস্টাল ভোট বন্ধ করতে চাওয়া অশনিসংকেত: আসিফ মাহমুদ

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলা ছিল: এফ এম সিদ্দিকী

আমরা শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ করি না—ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত

উত্তরায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতে জামায়াতের আমিরের শোক