আজকের পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে একটা ব্যতিক্রমী সংবাদ ছাপা হয়েছে। দেশে যখন প্রচণ্ড দাবদাহ চলছে এবং জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকেরা ভালোভাবে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না, সেই সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ের মোলানী গ্রামের সোলেমান আলীর উদ্ভাবিত ‘ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র’ ওই এলাকার মানুষের কাছে আশীর্বাদ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
সোলেমান আলীর উদ্ভাবিত ২ হাজার ৫০০ ওয়াট ক্ষমতার এই সৌরপাম্প সূর্যের আলোর মাধ্যমে প্রতি মিনিটে ৭০০ লিটার পানি উত্তোলন করছে। যেখানে একসময় কৃষকদের চাতক পাখির মতো বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, কিংবা ড্রামভর্তি তেল নিয়ে মাইলের পর মাইল ছুটতে হতো, সেখানে এখন রোদ বাড়লেই কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। প্রকৃতির এই রোদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেচকাজ পরিচালনা করা যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি এটি কৃষকের উৎপাদন খরচও অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তাঁর এই উদ্যোগের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, তিনি কেবল নিজের লাভের কথা ভেবে কাজটি করেননি। তাঁর কাছে থাকা ২৬টি পাম্পের মধ্যে ২০টি তিনি কৃষকদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে ভাড়া দিচ্ছেন। এতে প্রান্তিক কৃষকদের বেশি দামে পাম্প কিনতে হচ্ছে না এবং তাঁরা কম খরচে জমিতে সেচ দিতে পারছেন। আর তিনি পাম্প ভাড়া দিয়ে ভালোই আয় করছেন।
সামনে যে দেশের জ্বালানির সংকট আরও বাড়বে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ সময়ে আমাদের জরুরি ভাবনা হলো বিকল্প জ্বালানির দিকে নজর দেওয়া। কত দিন আমরা এভাবে পরনির্ভর হয়ে অর্থাৎ, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভর হয়ে থাকব?
বর্তমানে ওই এলাকায় সোলেমান আলীর তৈরি পাম্প দিয়ে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও স্বীকার করেছে, বর্তমান জ্বালানি সংকটের এই সময়ে একটি টেকসই সমাধান ওই পাম্পের মাধ্যমে করা সম্ভব। কিন্তু সন্দেহ হয়, সরকার কি এসব উদ্ভাবনকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে চাইবে? সরকারের চেয়ে বড় সমস্যা আমলাতন্ত্র। কৃষি বিভাগের বড় কর্তারা এ উদ্যোগকে কি সামনে এগোতে দেবেন?
প্রশ্নগুলোকে এক পাশে রেখে আমরা প্রত্যাশা করতে চাই—সরকারি সহায়তায় এই প্রযুক্তিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হোক। তাহলে সেচকাজে ব্যবহৃত হাজার হাজার টন ডিজেলের সাশ্রয় যেমন হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা করাও সম্ভব হবে।
সোলেমানের এই উদ্ভাবন যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হারিয়ে না যায়, সে জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাঁর এই ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র মডেলটিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রান্তিক পর্যায়ের এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে দেশেরই লাভ হবে।
সূর্য যে কেবল উত্তাপ ছড়ায় না, বরং কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসিও ফোটাতে পারে—সোলেমান আলী সেটিই প্রমাণ করেছেন। এখন জরুরি হলো রাষ্ট্রকে তাঁর পাশে দাঁড়ানো।