বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘লড়াই’ নামের একটি ছবি ছাপা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার জন্য টিসিবির ট্রাকের সামনে সমবেত আদম সন্তানদের উদ্বিগ্ন, প্রাণান্তকর অবয়বগুলো দেখা যায় ছবিতে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের এই জীবনসংগ্রাম কাউকেই স্বস্তি দেয় না। টিসিবির এই পণ্যসম্ভারের কাছে পৌঁছানো যাবে কি না, তা লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর কাছে বড় প্রশ্ন। এখানে পণ্য পাওয়া না গেলে হয়তো অনেকের হাঁড়িতে ভাত চড়বে না।
একটা সময় ভাবা হয়েছিল, সমাজে সাম্য চলে এল বলে। নানা ধরনের তাত্ত্বিক আলোচনায় ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে যাওয়ার যে প্রসঙ্গ উঠে আসত, সেগুলো এখন ক্ষীণভাবে কোনোরকমে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। জোর গলায় কথা বলার মতো সামর্থ্য তার নেই। সমাজবদল কিংবা শ্রেণিহীন সমাজ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একসময় রাজনীতি চলেছে, সে আকাঙ্ক্ষার ওপর এখন আর ভরসা রাখা যাচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’। সে কথা যেন আজকের পৃথিবীর জন্য জুতসই হয়ে দেখা দিয়েছে। যথার্থই বলেছিলেন কবি। একবিংশ শতাব্দীতে সারা পৃথিবী যেভাবে হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠছে, তাতে কে এখন শান্তির পথ দেখাবে, তার কোনো নিশানা পাওয়া যাচ্ছে না। দেশীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনীতি পর্যন্ত পুরো পথটাতেই ঘৃণা, অবিশ্বাস জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্ব পরিমণ্ডলের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার যে আপামর জনগণ, তাদেরই একটি অংশ আমাদের দেশে জীবনসংগ্রামে লিপ্ত। অথচ একটু ভালোবাসা, একটু পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ভাবনা, একটু পরস্পর সুসম্পর্ক এই মানুষদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারত।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২০২৪ সালের যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তাতে সাধারণ মানুষ নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেছিল। শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক জীবনেও একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এ রকম আশা পোষণ করেছিল সবাই। কিন্তু আদৌ কি সাধারণ জনগণের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে কোনো পরিবর্তন কি এসেছে? অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তারা বুঝিয়ে দিয়েছে সরকার কতটা হিংস্র ও উদাসীন হতে পারে। হামের টিকা কেনা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা থেকেই বোঝা যায়, কতটা হৃদয়হীনভাবে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রশ্নটি দেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যে ‘আমরা আর মামুরা’ ঐতিহ্যের জন্ম হয়েছিল, তারই ক্রমবিকাশ ঘটছে। ফলে টিসিবির ট্রাকের সামনে মরিয়া হয়ে পণ্য সংগ্রহের জন্য যারা হাজির হয়েছে, তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। গরিব আরও গরিব হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
দেশ ও দশের সেবার জন্যই রাজনীতি। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে, সমাজতন্ত্রের নামে, ধর্মের নামে যেভাবে রাজনীতিকে কলুষিত করা হয়েছে, তাতে এই নিরুপায় আদম সন্তানেরা মুক্তির দিশা পাবে কী করে? শুধু মুখের কথায় দিন বদলানো যায় না। দেশের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করেই জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নইলে বেঁচে থাকার এই লড়াই চলতেই থাকে, তার শেষ থাকে না।