সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী চাঁদাবিষয়ক যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাতে দেশের জনসাধারণ দ্বিধায় পড়ে আছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই তা বোঝা যায়।
তাঁদের আলোচনা-সমালোচনার পরে মন্ত্রী কিন্তু এক টক শোতে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নিয়ে থাকে। সেটাকে তিনি চাঁদাবাজি বলছেন না। বরং, বিধির বাইরে কেউ জোর করে টাকা আদায় করতে চাইলে সেটাই চাঁদাবাজি বলে আখ্যা দিয়েছেন। যা-ই হোক, এই চাঁদা সংজ্ঞার চর্চা চলতে চলতেই কিশোরগঞ্জ-ভৈরব সড়কে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে একজনের নামে চাঁদা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
ভাগিনা নাঈম—এই নামেই পরিচিত চাঁদা উত্তোলনকারী সেই ব্যক্তি। কটিয়াদী হাইওয়ে থানার পরিদর্শক মো. মাগরুব তৌহিদ ভাগনে বলেই পরিচয় দেন নাঈমকে। ‘কাজের সুবিধার্থে’ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তিনি তাঁর ‘বেকার’ ভাগনে নাঈম হাসানকে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করতে দেন। তবে সেখানে ‘চাঁদাবাজি’ হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
ওই রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যান, মাইক্রোবাস ও দূরপাল্লার বাস চলাচল করে। চালকদের অভিযোগ, ভাগিনা নাঈম পুলিশের পোশাক পরে টোকেনের মাধ্যমে মাসিক চাঁদা আদায় করেন। নির্দিষ্ট প্রতীকযুক্ত টোকেন কিনলে মাসজুড়ে কোনো ঝামেলা থাকে না। তবে টোকেন না থাকলে কাগজপত্র ঠিক থাকলেও মামলা, রিকুইজিশনসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয় তাঁদের। আর নাঈমের কথা না শুনলে মারও খেতে হয়! তাঁরা শুধু ভাগনেকে না, মামা মাগরুবকেও এ ব্যাপারে অভিযুক্ত করছেন।
আজকের পত্রিকায় ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সংবাদে মামা-ভাগনের চাঁদা তোলার যে হিসাব দেখানো হয়েছে, তা জানলে চোখ লাফিয়ে কপালে ওঠার অবস্থা হয়! যানবাহনভেদে মাসে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা নিলে মাসে এর মোট পরিমাণ দাঁড়ায় অর্ধকোটি টাকার বেশি। কটিয়াদী ও ভৈরব—দুই থানা মিলিয়ে যা কোটি টাকার বেশি হতে পারে। এই টাকা থেকেই মামা-ভাগনের আয়-রোজগার হয় কি না, কে জানে!
মাগরুবের কথা অনুযায়ী ধরে নেওয়া যাক, কিশোরগঞ্জ-ভৈরব সড়কে ‘চাঁদাবাজি’ হয় না। কিন্তু সংবাদের সঙ্গে প্রকাশিত ছবি থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, নাঈম ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন কটি বা রিফ্লেকটিভ ভেস্ট গায়ে চেপে আছেন, যা একজন সাধারণ নাগরিক হয়ে তিনি করতে পারেন না।
পুলিশের নির্ধারিত পোশাক শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুমোদিত সদস্য কর্তব্যরত অবস্থায় পরতে পারেন। সাধারণ নাগরিক বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্যের জন্য এই উর্দি পরা আইনত নিষিদ্ধ। তেমনি রিফ্লেকটিভ ভেস্ট মূলত দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ, সার্জেন্ট, ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার এবং ট্রাফিক মনিটররা পরতে পারেন। এর কোনটি যে ‘ভাগিনা নাঈম’ তা কে বলতে পারে?
হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ এবং ভৈরব হাইওয়ে থানার ওসি শওকত হোসেন তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা আমরা বিশ্বাস করতে চাই। নয়তো রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা হুমকির মুখেই পড়ে থাকবে।