এমনিতেই গ্রীষ্মের তাপ জ্বালাচ্ছে দেশবাসীকে। তার ওপর জ্বালা বাড়িয়ে দিল জ্বালানির বাড়তি দামের ঘোষণা। ২০ এপ্রিল আজকের পত্রিকার মূল শিরোনাম তো তা-ই বলছে—‘জ্বালানির জ্বালা ঘরে-বাইরে’। জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫-২০ টাকা বেড়েছে। বাস-লঞ্চের মালিকেরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র নন। তাঁরাও চাইছেন পরিবহন ভাড়া বাড়াতে। এরই মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, যেটাকে এলপিজি নামে আমরা সহজে চিনি, সেটার দাম বেড়ে গেছে। আশঙ্কা রয়েছে খুব তাড়াতাড়ি বিদ্যুতের দামও বাড়বে। এ রকমটা হলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো অবস্থা হবে। প্রকাশিত সংবাদটিতে স্পষ্ট করেই বলা আছে, এসব পণ্যের বাড়তি দামের প্রভাব পড়বে আমাদের অর্থনীতির ওপর।
ছোট করে আগে জেনে নেওয়া যাক কীভাবে অর্থনীতির গতি শ্লথ হতে পারে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সব খাতে ব্যবহৃত হয়—পরিবহন, শিল্প, কৃষি, উৎপাদন। দাম বাড়লে সব পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে, ফলে বাজারে পণ্যের দামও বাড়ে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায়। যখন জ্বালানি কিংবা বিদ্যুতের জন্য বেশি খরচ করতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ অন্যান্য পণ্যে কম খরচ করে। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে যায়। জ্বালানির দাম বাড়লে কিন্তু পরিবহনেও প্রভাব ফেলে—সব পথেই পরিবহন খরচ বাড়ে এবং এতে করে পণ্যের দামও বাড়ে। আবার পণ্যের উৎপাদন খরচ বেশি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা কমতে পারে। ফলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। যদি খরচ সামলাতে না পেরে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্মীদের ছাঁটাই করতে থাকে, তাহলে বেকারত্ব বাড়বে। আবার নিম্ন মজুরি দিলে কর্মীদের সংসার চালাতে হিমশিম তো খেতেই হবে।
আর এই সবকিছু মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে খুব বেশি সময় নেয় না। এবার একটু ভাবা যাক কেন বাড়বে জ্বালানির দাম। খুব সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি বারবার বন্ধ করে দিচ্ছে ইরান। তাই এই প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানির জাহাজ বাংলাদেশে সহজে আসতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে পুরো বিশ্বেই বেড়েছে জ্বালানির দাম। বাংলাদেশে কিছুদিন মজুতকৃত জ্বালানি আগের দামেই কেনা গেছে। কিন্তু এবার বেড়েই গেল।
এদিকে জ্বালানিমন্ত্রী বোঝাতে চাইছেন, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, ১০টি পাম্প ঘুরে তিনি কোনো সংকট দেখতে পাননি। তাহলে সেগুলো কোন পাম্প, যেখানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়? চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তেল-গ্যাস কেনার জন্য। এ নিয়ে নিয়মিত সংবাদও প্রকাশিত হচ্ছে।
মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত ও কালোবাজারির কারণে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট দ্রুত মোকাবিলা করে সাশ্রয়ে মানুষকে জ্বালানি কেনার ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। নয়তো অর্থনীতিতে যেই খড়্গের আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা জনজীবনকে অসহনীয় করে তুলবে।