‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’ প্রবাদটিই যেন সত্যে প্রমাণিত হতে চলেছে খুলনা নগরের উপকণ্ঠে রূপসা সেতুর নিকটবর্তী মাথাভাঙ্গা মৌজার ৩২টি দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের মানুষের কাছে। কারণ, এখানে বসবাসরত পরিবারগুলোর জমি জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে। জায়গাটি একসময় বিরান ভূমি ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই জমির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভূমিদস্যুর চোখ পড়েছে সেখানে। এ নিয়ে ১২ জানুয়ারি আজকের পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
সংবাদ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ জমির মালিক ছিলেন রামচরণ মন্ডল। তিনি দেশত্যাগ করলে জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর ১৯৭২ সালে নাজির আহম্মেদ মোল্লা এর বন্দোবস্ত পান। তারপর কয়েকবার হাতবদলের পর বর্তমান ৩২টি পরিবার জমিটি কেনে। এই মানুষগুলো আবার খুবই দরিদ্র। যখন এখানকার জমির খুব কম দাম ছিল, তখন তাঁরা এই জমি কিনে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের একটি একতরফা ডিক্রিকে পুঁজি করে নতুন করে দখলবাজির খেলা শুরু হয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের জুন মাসে উচ্চ আদালত এই জমির ওপর স্থগিতাদেশ এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু আদালতের আদেশকে অমান্য করে ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজের মালিক আল মামুন এখন এ জমির মালিকানা দাবি করে তাঁদের উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছেন। তিনিই যদি প্রকৃত মালিক হন, তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে এখন অসহায় মানুষগুলোকে জীবননাশের হুমকি দিচ্ছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিরন্ন মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করতে চান।
ভুক্তভোগীরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। কিন্তু লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য এ ক্ষেত্রে বেশ গা-বাঁচানো বলে মনে হচ্ছে। অভিযোগ আদালতে পাঠানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে যখন সরাসরি হুমকির ঘটনা ঘটছে এবং স্থিতাবস্থা লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখন পুলিশি তৎপরতা কেবল নথিপত্র চালাচালিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এই অসহায় পরিবারগুলোর জানমালের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব।
যাঁরা দিনমজুর, গৃহকর্মী বা সামান্য বেতনে মসজিদের মুয়াজ্জিম, তাঁদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া পাহাড় টপকানোর মতো কঠিন। এই সুযোগটিই নিতে চায় ভূমিদস্যুরা। আমরা মনে করি, যেহেতু উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে, তাই সেখানে কোনো প্রকার অনুপ্রবেশ বা সাইনবোর্ড টাঙানো সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রশাসনকে অবিলম্বে ওই সাইনবোর্ড অপসারণ করতে হবে। অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে দখলচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধীর ঢাল না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই ৩২টি পরিবারকে যেন আইনি মারপ্যাঁচে পিষ্ট হয়ে তাদের শেষ সম্বল হারাতে না হয়, সে জন্য সরকারি আইনি সহায়তা সংস্থার সহায়তা খুব দরকার। আমরা আশা করি, খুলনার স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে এই ভূমিদস্যুর লাগাম টেনে ধরবে এবং অসহায় পরিবারগুলোর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।