এমনিতেই দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাই সুস্থ ধারার কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সেগুলো প্রদর্শনের জন্য পর্দার অভাব হয়। এমন পরিস্থিতিতে যখন পরিবার নিয়ে দেখার মতো একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেটি সংস্কৃতির গোড়ায় কুড়াল মারার মতো একটি কাণ্ড নয় কি? উদ্বিগ্ন করা এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একটি গোষ্ঠী।
গত ৩০ মে, শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীর আয়োজন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। এই আয়োজনের বিষয়টি জানার পর শহরের কওমি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে প্রচারণা চালায়। সম্ভাব্য উত্তেজনার কথা বিবেচনায় করে প্রদর্শনী স্থগিত করে দেয় জেলা প্ৰশাসন। ওই দিন রাতে কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামে সিনেমাটি প্রদর্শন করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটিও প্রশাসনের বাধায় বন্ধ করা হয়।
আচ্ছা, এমনও তো হতে পারত—সম্ভাব্য উত্তেজনার কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করার পর সিনেমাটির প্রদর্শনী করা যেত। কিন্তু প্রশাসন পরোক্ষভাবে প্রদর্শনী বন্ধের আহ্বায়কদের পক্ষ নিল। তারা কি সংখ্যা ও শক্তিতে প্রশাসনের চেয়ে বেশি এবং বলবান? যদি তা-ই হয়, তাহলে তো প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ ফিল্ম সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩ অনুযায়ী প্রদর্শন করার অনুমতিপ্রাপ্ত। তাই যেকোনো দর্শক একে পারিবারিক সিনেমা হিসেবেই আখ্যা দেবে। সর্বজনীন, সুস্থ, নন্দিত এই শিল্প প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে কেন বাধা দেওয়া হলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সন্দেহ হয় যে এটা নিশ্চয় দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলার কোনো ষড়যন্ত্রের সূক্ষ্ম সূচনা। যেমন এর আগেও শহরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হেলাল মিয়া এবং তাঁর পরিবারকে গান গাওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
এ কথা অনস্বীকার্য যে কোনো সমাজে যদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড না থাকে কিংবা ধীরে ধীরে কমে যায়, তাহলে এর নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব, নৃত্য, গান, নাটক বা সিনেমা মানুষকে একত্র করে। আর এসব যদি সমাজে না থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতি কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সংস্কৃতি চর্চার অভাবে লোকজ ঐতিহ্য, ভাষা, গান, নাচ ও প্রথাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যখন এ ধরনের শিল্প-সংস্কৃতির অভাব দৃশ্যমান হয়, তখন মানুষের কল্পনাশক্তি, সংবেদনশীলতা আর মানবিক গুণাবলি বিকাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে তারা গঠনমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যেতে পারে। সুস্থ বিনোদন ও সংস্কৃতি চর্চা মানুষকে ভিন্নমত, ভিন্ন জীবনধারা এবং ভিন্ন ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে শেখায়। এর অভাবে সংকীর্ণতা ও অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা থাকে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার।
রাষ্ট্রের রক্ষাকর্তারা নিশ্চয় ভালো জানেন, এমন অবস্থায় কী করতে হয়।