তিন দিকে নদীবেষ্টিত ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে লাগোয়া কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড় এলাকা। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কালজানি নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এলাকটি। শুধু একটি সেতুর অভাবে এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যুগের পর যুগ। নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই এলাকার মানুষ শুধু একটি পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে, আগে তারা পালতোলা নৌকা ও লগি-বৈঠার সাহায্যে ডিঙি দিয়ে নদী পার হতো, আর নতুন প্রজন্ম ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে নদী পার হচ্ছে। এই চিত্রই বলে দেয়, আধুনিক এই সময়ে এলাকাবাসী কতটা দুর্ভোগে আছে।
একটি সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি ওই এলাকার মানুষের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক কাজের অতি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো হওয়ার কথা ছিল। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই জনপদের ভাগ্যবদল হয়নি। সরকার আসে, সরকার যায়; নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফোটে, কিন্তু নদীর ওপর একটি সেতুর অভাবে কয়েক হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস ভারী হতেই থাকে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এই বিচ্ছিন্নতা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আধুনিক যুগেও এলাকার একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে নদীর ঘাটে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল হাটে নিতে গিয়ে নৌকা ভাড়ার অতিরিক্ত চাপে পড়ে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার মতো অবস্থা হয়। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই যাতায়াত বিড়ম্বনার কারণে থমকে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার পথে নদীটি এক বিশাল বাধা। ফলে এলাকার ছেলেমেয়েরা বেশি দূর পড়ালেখায় এগোতে পারছে না। কারণ যোগাযোগহীনতার কারণে শিক্ষকেরা এ এলাকায় থাকতে চান না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
রাত ১০টার পর নৌকা চলা বন্ধ হলে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে আকাশচুম্বী নৌকাভাড়া দেওয়া প্রমাণ করে, এই আধুনিক যুগেও তারা একপ্রকার বন্দী জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আশ্বাস দিয়েছেন যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আনা হবে। কিন্তু আমরা মনে করি, শুধু নজরে আনা কিংবা আশ্বাস দেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। কালজানি নদীর ওপর একটি সেতু এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি শালজোড়বাসীর বেঁচে থাকার অধিকার।
এখানে একটি সেতু নির্মিত হলে শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হবে না, বরং কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চলের অর্থনীতি চাঙা হবে, শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছাবে এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাই, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অগ্রাধিকারের দোহাই না দিয়ে অবিলম্বে কালজানি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হোক। সরকারের উন্নয়নের ভাবনা যেন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, কালজানির ওপারের অবহেলিত মানুষের জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটুক। অন্তত একটি সেতু তাদের দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক হোক।