গত মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পুরাতন ফজিলাতুন নেছা হলের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন এক শিক্ষার্থী। এ সময় হঠাৎ তাঁর পিছু নেওয়া এক ব্যক্তি তাঁকে গলায় দড়ির মতো কিছু একটা দিয়ে পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যায়। করে ধর্ষণচেষ্টা। কয়েকজন ছাত্র ওই দিক দিয়ে যাওয়ার সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর চিৎকার শুনতে পান। তবে তিনি নিজেই পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। ছাত্ররা অন্ধকার জঙ্গলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে খোঁজার চেষ্টা করেও পাননি, তাঁরা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। পরে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
আজকের পত্রিকায় এমন একটি খবর প্রকাশিত হওয়ার পর নিশ্চয়ই পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এখনো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এতটা অনিরাপদ কেন? বহু ধর্ষণের ঘটনা এই জাবি ক্যাম্পাসে আগেও হয়েছে। তাহলে এখনো কেন নিরাপত্তার ঘাটতি থাকবে সেখানে?
জাবি ক্যাম্পাসটি এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বরাবরই বহিরাগত ব্যক্তিদের আকর্ষণের তালিকায় রয়েছে। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও সাধারণের আনাগোনা হয় প্রচুর। ক্যাম্পাসের ভেতর গাছপালায় ঘেরা নিরিবিলি অনেক জায়গা থাকায় সেখানে অপরাধও কম হয় না। সেসব অপরাধে কখনো জড়িত থাকে শিক্ষার্থীরা, কখনো বহিরাগত ব্যক্তিরা। ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণচেষ্টার মতো ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশিই হয়তো হয়েছে জাবির জঙ্গলে। এ নিয়ে নানা সময় সচেতন শিক্ষার্থীরা গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। পঞ্চাশোর্ধ্ব বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন অপরাধের সংস্কৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে বছরের পর বছর। এমন অবস্থায় কোনো মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে এই প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠাতে চাইবেন?
অনেকের মনে পড়ে যেতে পারে, ১৯৯৮ সালে ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক জসিমউদ্দিন মানিক ১০০ নারী ধর্ষণ উদ্যাপন করেছিলেন। পরে ক্যাম্পাসে শুরু হয় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। বছরব্যাপী আন্দোলনের পর ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অসংখ্য ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত জসিমউদ্দিন মানিক এবং তাঁর সশস্ত্র ক্যাডারদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ব্যস, এটুকুই হয়েছিল তাঁদের শাস্তি।
উপযুক্ত বিচার না হলে কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি কায়েম হলে দুষ্ট লোকেরা তো বারবার অপরাধের পথেই হাঁটবে। যেমনটা মানিক গং করত আন্দোলনকারীদের নানাভাবে হেনস্তা করে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তো কিছুতেই দায় এড়াতে পারে না, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিয়েও সন্দেহ করা যায়।
বর্তমানে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে এত এত সিসিটিভির নজরদারি থাকতেও কোন সাহসে সেখানে কেউ অপরাধ করতে যায়, তা এক রহস্য বটে। সাম্প্রতিক ঘটনাটিতেও সিসিটিভি ফুটেজে অপরাধীর মুখশ্রী দেখা গেছে, কিন্তু তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়নি। আমরা আশা করব, এই ‘গুণধর’ যে-ই হোন না কেন, তাঁকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিধি অনুযায়ী দণ্ড দেওয়া হবে। নয়তো মানিকদের মতো তিনিও বীরদর্পে চলাফেরা করতে পারবেন।