তোফায়েল আহমেদ মারা যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব মন্তব্য আর টিপ্পনী দেখলাম, তাতে আমি নিশ্চিত এই জাতির মানসিক সুস্থতা নেই। তার চিকিৎসা এখন সময়ের চাওয়া। মানুষ নশ্বর শরীর নিয়ে পৃথিবীতে আসে, তারপর সময় হলে চলে যায়। এটা নিয়তি, এটাই বিধান। যে যত বড় মানুষ বা বড় ক্ষমতার অধিকারী হোক না কেন, এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না। তোফায়েল ভাই স্বাভাবিক নিয়মে লোকান্তরিত হয়েছেন। বুঝলাম তিনি সবার জন্য ভালো ছিলেন না। তেমন ভালো থাকাটা সম্ভবও না। আপনি নিজেকে দিয়ে ভাবেন না কেন?
আপনি যদি আপনার পরিবারের কারও প্রতি বেশি দুর্বল হন, তার মানে এই যে আরেকজনের প্রতি হয়তো আপনি কম দুর্বল। অথবা বড় কোনো ক্যানভাসে ভাবুন—ইরানের জন্য সমব্যথী বা দেশটির পক্ষ নিলে আপনি কোনোভাবেই ইসরায়েলের বন্ধু হতে পারেন না। এই যে সমীকরণ, এর একটা ধারাবাহিক নিয়মেই তোফায়েল আহমেদ একটি বিশেষ দলের ছিলেন। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় আছে ইতিহাসে।
এখন আপনি সে ইতিহাস না-ই মানতে পারেন। কিন্তু তাই বলে কি ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে? ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলবেই। মূল কথা হলো, মৃত্যুর পর একজন মানুষের সম্পর্কে যা তা বলা বা তাঁকে নিয়ে যে অপপ্রচার আর নিন্দা বা ঘৃণা দেখলাম, তাতে এটা নিশ্চিত যে আমাদের সমাজ আর আগের জায়গায় নেই। এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে যে তার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না করলে সে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়বে।
সমাজে নানা কারণে ঘৃণার জন্ম হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন—
বৈষম্য ও পূর্বাগ্রহ: সমাজে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য এবং পূর্বাগ্রহের কারণে
কিছু গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণার অনুভূতি সৃষ্টি
হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জাতি, ধর্ম,
বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য ঘৃণার জন্ম
দিতে পারে।
গোষ্ঠী পরিচয়: যখন একটি গোষ্ঠী নিজেদের অন্য গোষ্ঠীর থেকে পৃথক মনে করে, তখন তারা বিপরীত গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা অনুভব করতে পারে। এটি সামাজিক বিভাজন এবং সংঘাতের একটি কারণ।
নেতিবাচক আবেগ: দুঃখ, হতাশা এবং ক্রোধের মতো নেতিবাচক আবেগের কারণে ঘৃণার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। যখন আমরা নিজেদের অসহায় মনে করি, তখন অন্যদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করতে পারি।
আবেগের প্রতিফলন: অনেক সময় ব্যক্তির নিজের ভেতরের নেতিবাচক অনুভূতি বা অসন্তোষ অন্যদের প্রতি ঘৃণা হিসেবে প্রকাশিত হয়।
মানসিক চাপ: উচ্চ মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের ফলে মানুষ ঘৃণার অনুভূতি অনুভব করতে পারে। এটি কখনো কখনো মানসিক অসুস্থতার একটি লক্ষণও হতে পারে।
কম আত্মবিশ্বাস: যখন আমরা নিজেদের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকি বা আত্মবিশ্বাসের অভাব অনুভব করি, তখন অন্যদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করতে পারি।
ঈর্ষা: অন্যের সফলতা বা সুখের প্রতি ঈর্ষা আমাদের ঘৃণার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। আমরা যখন মনে করি যে অন্যরা আমাদের চেয়ে ভালো, তখন এটি আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার অনুভূতি জন্মায়।
অবস্থান ও ক্ষমতা: সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতার কারণে অন্যদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করতে পারি। যখন কেউ আমাদের ওপর আধিপত্য রাখে, তখন আমরা তাদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করতে পারি।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি: আমাদের সমাজ এবং পরিবারে যে শিক্ষা বা সংস্কৃতি পেয়েছি, তা আমাদের ঘৃণার অনুভূতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কখনো কখনো আমাদের চারপাশের মানুষ বা পরিবেশের কারণে আমরা কিছু মানুষের প্রতি ঘৃণা করতে শিখি।
এখন আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি, কেন মানুষ ঘৃণা করে। কিন্তু এত কারণের বাইরেও আরেকটি কারণ আমাদের সমাজে ঘৃণার বিস্তার ঘটাচ্ছে। যার নাম প্রতিশোধ।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রতিশোধ প্রবণতা নিজেদের বিরুদ্ধে। দুনিয়ার আর কোনো জাতিতে এমন আত্মবিধ্বংসী ঘৃণা দেখা যায় না। আমাদের কাছে পরাজিত আমাদের দুশমন এক রাষ্ট্র ও জাতির বিরুদ্ধে এভাবে এগিয়ে আসার ভেতর মানসিক যে দৈন্য, তার নাম জিঘাংসা। এই জিঘাংসা বহু নামী মানুষেরও ছাড় দেয়নি।
আমাদের দেশে এমন সব মানুষ আছেন, যাঁদের পদ-পদবি অনেক বড়। কিন্তু তাঁদের অন্তর ছোট। সে ছোট যে কত ছোট, সেটা আর বলার দরকার পড়ে না। ভূতপূর্ব প্রেস সচিব তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পর সামাজিক মিডিয়ায় কেউ কেউ যা লিখেছেন, তাতে তাঁদের সুস্থ ভাবা মুশকিল। আমি শুধু একটা কথা ভাবি—তাঁরা কি অমর? না তাঁরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে উন্মাদ?
যে কথা বলছিলাম, আমাদের যে প্রজন্ম বড় হয়ে দেশের হাল ধরবে বা দেশ চালাবে, তারা যা দেখে, যা শুনে, যা জেনে বড় হচ্ছে, তা ভয়াবহ। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি, এই যে লব্ধপ্রতিষ্ঠ সন্তানদের মায়ের করুণ মৃত্যু হলো ঢাকার এক ফ্ল্যাটের নোংরা পরিবেশে, তারপর সন্তানদের ওপর মানুষের ঘৃণা বা পরবর্তী সময়ে সরকার মাঠে নামল, এতে কী বোঝা যাচ্ছে? এটা কি সাধারণ বোধসম্পন্ন মানুষের সমাজ? আমরা এত দিন পাশ্চাত্যকে দোষারোপ করে পার পেতাম। দীর্ঘ ৩০ বছর সিডনিতে থেকে আমি নিজে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে রাজি। কারণ সেখানে বন্ধুবান্ধব থাকে, মানুষজন থাকে, সঙ্গ ও সঙ্গী পাওয়া যায়। দেখভাল থেকে শেষযাত্রা—কোনোটাই এমন অনিরাপদ বা মর্মান্তিক হয় না। তবে এসব দেশে যাঁদের কেউ নেই, তাঁদের এমন লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু যাঁদের সব আছে, সন্তানেরা প্রতিষ্ঠিত, এক শহরে থাকে, তাঁদের বেলায় এটা মানা কঠিন।
এর মানে এই, আমাদের সমাজকাঠামো ভেঙে পড়েছে। রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে আমরা যেমন ভাবলেশহীন, তেমনি শিক্ষক বা গুরুর গলায় জুতার মালা, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানেও আমরা হি হি হা হা করতে শিখে গেছি। এখন দেখা যাচ্ছে গর্ভধারিণীর বেলায়ও আমরা নিশ্চল আর চেতনাহীন।
এসব উসকে দেওয়ার জন্য যারা দায়ী, তারা যত বড় বা ছোট হোক না কেন, তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। আমাদের বয়স হয়ে গেছে। যেসব মুরব্বিগোছের লোকজন ঘৃণা ছড়ায়, তাদেরও চাওয়া-পাওয়া শেষ। আমাদের ভাবনার বিন্দু এই সমাজের শিশু-কিশোর আর তরুণ-তরুণীদের দিকে ধাবমান। তাদের বাঁচাতে হবে। গান গাইলে, অভিনয় করলে, নাচ করলে, পড়ালেখা করলে, রাজনীতি করলে তাদের সবাই যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার শিকার হয়, তো এই দেশ বাঁচবে কীভাবে? মতপার্থক্য আর মতবিরোধিতাকে সম্মান আর শ্রদ্ধা করার কাজটি মবের হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিজেরা করলে হয়তো পথ পাওয়া যেতে পারে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী, কলামিস্ট