হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন

পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এর গুরুত্ব

আব্দুর রহমান 

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘বিশ্বের প্রথম জেন-জি প্রভাবিত’ নির্বাচন। এই নির্বাচনের নির্ণায়ক বা নির্ধারক ভূমিকায় তরুণেরা। গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। একই সঙ্গে এই নির্বাচনের ভূরাজনৈতিক আবেদনও বিশাল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাজানো, পাতানো ও ভোটাধিকার হরণের বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে তরুণদের বড় অংশই ভোট দিতে পারেনি। এবার ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি ব্যাপক হবে। তাদের এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট যাঁরা পাবেন, তাঁরাই বিজয়ী হবেন। তাই এই দুই ধরনের ভোট টানতে দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারে চেষ্টাও দেখা গেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণত যে পরিমাণ সহিংসতা নির্বাচনের আগে হয়ে থাকে, এবারে তার চেয়ে অনেক কম সহিংস ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে তুলনামূলক আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন থেকে বঞ্চিত থাকার পর সাধারণ মানুষও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য নিজ নিজ নির্বাচনী আসনে গিয়েছে। এমন একাধিক প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। জরিপে বলা হয়েছে, ভোটাররা বিপুলভাবে ভোট দিতে আগ্রহী। তাঁরা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয় নয়, বরং দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁরা এমন নেতৃত্ব চান, যাঁরা দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং জনগণের প্রতি যত্নশীল থাকবেন।

বাংলাদেশের এই নির্বাচনকে ‘ব্যালটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৫৬ সদস্যের দল পাঠিয়েছে। তারা আহ্বান জানিয়ে বলেছে, নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া যেন বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ থাকে, তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। কমনওয়েলথও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ২৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে। তারাও নির্বাচনের মাধ্যমে ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণে’ বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত এবং তিনি এর ফলাফল দেখতে আগ্রহী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন হবে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনও বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে তিন সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে। তবে তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করেনি।

এই নির্বাচনে বড় পরিবর্তন হলো নয়া রাজনৈতিক মেরুকরণ। নতুন রাজনৈতিক জোটের উত্থান দীর্ঘদিনের দুই প্রভাবশালী দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বিএনপির নেতৃত্বে আসা তারেক রহমান দল ভালো করলে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

জামায়াতে ইসলামী ও ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মিলে ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে। এটি আদর্শগত নয়, বরং কৌশলগত। ভারতীয় প্রভাববিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান দুই দলের মিলের বড় কারণ। তারা হাসিনার প্রত্যর্পণ ও হাদির বিচার দাবি করছে। বিএনপি ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’র আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দলে টানার চেষ্টা করেছে এবং জরিপ বলছে, প্রায় ৪৮ শতাংশ আওয়ামী লীগ সমর্থক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছেন।

জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। তরুণ ভোটাররা (১৮-৩৭ বছর) মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশ এবং ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন জোটকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এতে এনসিপির প্রভাব বাড়লেও তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি আছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য সুযোগ হলেও, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের এই নির্বাচনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। বাংলাদেশের এই নির্বাচন প্রতিবেশী ভারতের রাজনৈতিক চালচিত্রকে পাল্টে দিতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একই সঙ্গে, আরেক প্রতিবেশী নেপালেও জেন-জি আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন হয়েছে। দেশটিতে আগামী মার্চে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আন্দোলনের চরিত্রগত সাযুজ্য থাকায় বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল নেপালের নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করবে।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব হলো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিবেচনায়। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক একেবারে তালানিতে ঠেকেছে। দিল্লি আশা করছে, নির্বাচিত সরকার এলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হবে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো, ভারতের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আগের সেই শক্ত অবস্থান আর নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব যখন কিছুটা স্তিমিত, তখন বেইজিং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে।

মার্কিন থিংক ট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ গবেষক জশুয়া কার্লান্তজিক বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার বাস্তব অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে চীনের কৌশলগত চিন্তায় বাংলাদেশ এখন কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে এসেছে। চীন আত্মবিশ্বাসী যে এই কৌশলে বাংলাদেশ চীন-ঘনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে। তবে নির্বাচনে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে তবে চীন-ভারতের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবিরের মতে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আবার স্থিতিশীল হতে পারে। তিনি আরও বলেন, একসময় ভারতের সঙ্গে তীব্র বিরোধে থাকা জামায়াতে ইসলামীও এবারের নির্বাচনে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে।

আবার বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বাণিজ্য চুক্তি বিবেচনায়ও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করবে, তাতে তাদের সায় রয়েছে। চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বাংলাদেশের সঙ্গে ‘তেল-গ্যাস’ ব্যবসার বিষয়ে আগ্রহী হয়েছে।

সব মিলিয়ে, কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশের এই নির্বাচন বিশ্বের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জন্য এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা সুষ্ঠু নির্বাচন

নতুন শুরুর অপেক্ষায়

দ্বন্দ্ব ছিল, দ্বন্দ্ব থাকবেই

৫ টাকার অফিসার ও ভোট গ্রহণে টিমওয়ার্ক

জ্যামিতি, বিজ্ঞান ও সমাজ

ভাষা, ব্যাকরণ ও ছাগল

অঙ্গীকারের মেঘ ঝরুক প্রাপ্তির বৃষ্টি হয়ে

ভোটের ডামাডোলে চাপা বন্দর রক্ষা

কীভাবে একটি চুক্তি নতুন করে লিখে দিল জ্বালানিনির্ভরতা

‘না’ বিজয়ী হলে রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রায়ণ করার সুযোগ হাতছাড়া হবে: আলী রীয়াজ