সত্যি বলতে কি, এখন আর আমাদের অনেকেরই গ্রামে মন বসছে না। শহরের রঙিন জীবনের হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। ওখানে আহা রে কত সুখ! কাজকম্ম আর টাকা, টিনের ঘর ছেড়ে দালানে বসবাস। একবারও আমাদের মনে এতটুকু চিন্তা আসছে না যে ওসব দালানের সুখের জন্য আমরা কী হারাচ্ছি! গ্রামের সেই শ্যামল গাছপালা আর মায়াবী প্রকৃতিমাতার কোল ছেড়ে রুক্ষ ইট-কাঠ-পাথরের শহরের বাসিন্দা হতে আমরা উন্মুখ হয়ে বসে আছি। গ্রাম ছেড়ে সংগত কারণেই এখন অনেক মানুষ নগরবাসী হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ শহরে বা নগরে বাস করে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুসারে ২০৫০ সালে এ পরিমাণ ৬৬ শতাংশে পৌঁছাবে। তার মানে পৃথিবীর প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ মানুষ শহরে বাস করবে। দ্রুত নগরায়ণ ও নগর সম্প্রসারণের ফলে শহুরে খাদ্য সরবরাহের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক শহর দ্রুত সবুজ স্থানগুলো হারিয়ে ফেলছে, ফলে নগরের তাপ বাড়ছে, বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং অনেকগুলো বিষয় আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানির কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশবিদেরা বলছেন, নগরে যেভাবেই হোক সবুজ এলাকা বাড়াতে হবে। তা না হলে নগরবাসীদের জীবনের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে। এর অন্যতম প্রধান দুটি উপায় হলো, শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বাগান, উদ্যান, খুদে বন ইত্যাদি গড়ে তোলা। এগুলোর জন্য চাই পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা। সে জায়গা শহরগুলোতে কে দেবে? এক শতক জমি যেন শহরে হিরের টুকরার মতোই মূল্যবান। কেউ বন আর গাছগাছালির জন্য জমি ছাড়বে না, সরকারও না। রাস্তার ধারগুলো বিপণিবিতান ও দোকানপাটে ভর্তি। সেখানেও গাছপালা লাগানোর সুযোগ সীমিত। তাই নগরবিদেরা এখন নজর দিচ্ছেন যেসব জমির গাছপালা খালি করে সুউচ্চ ভবন উঠছে, সেগুলোর মাথার ছাদে, ব্যালকনিতে এমনকি ঘরের ভেতরেও সবুজ গাছপালা লাগানো।
ছাদবাগানের একটা বড় সুবিধা হলো, শহুরে খাদ্য সরবরাহে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দূরদূরান্ত থেকে আসা দীর্ঘ সময়ের পরিবহনের অনেক কাঁচা সবজি ও ফলমূল সতেজ থাকে না, পুষ্টিগুণও কমে যায়, পথে-বিপথে সেগুলোতে নানা রকম বালাইয়ের সংক্রমণ ঘটে। তাই নগরবাসীর একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ যদি ছাদেই কিছু শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন করতে পারে, তাহলে তা থেকে নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান হতে পারে। পরোক্ষভাবে এরূপ খাদ্য সরবরাহ পরিবহনজনিত জ্বালানি হ্রাস পাওয়ায় পরিবেশের ওপর তার একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ছাদে চাষাবাদ সে ছাদের আশপাশের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে, এমনকি বায়ু ও শব্দদূষণও কমায়। ছাদের গাছপালা বৃষ্টির পানি ধরে রাখে, শোষণ করে ও বাতাসে আর্দ্রতা ছাড়ে, যা পরিবেশের মঙ্গল করে। গাছপালাভরা ছাদ যেকোনো মানুষের জন্য একটি চমৎকার বিনোদনেরও জায়গা সৃষ্টি করে, কায়িক পরিশ্রমেরও সুযোগ করে দেয়। ছাদের অনেক গাছপালা অনেক ধরনের জীবকে আশ্রয় দিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখে। এসব গাছপালায় বিভিন্ন পাখি বাসা বাঁধে, ফল খায়, ফুলে প্রজাপতিরা আসে।
সারা বিশ্বেই এখন নগরে নগরে ছাদবাগানের জন্য গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জার্নাল অব আরবান ম্যানেজমেন্ট, ডিসেম্বর ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে গবেষক মাস্তুরা সাফায়েত, মো. ফারুকুল আরেফীন ও মো. মুসলেহ উদ্দিন হাসান লিখেছেন, সিঙ্গাপুর বর্তমানে স্থানীয় সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে দেশটির চাহিদার মাত্র ৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে। অথচ তারা যেসব পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু সরকারি আবাসন এলাকাগুলোর ছাদে চাষাবাদ করা হলে এই হার বেড়ে হবে ৩৫.৫ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরের কার্বন ফুটপ্রিন্ট বার্ষিক প্রায় ৯০৫২ টন নির্গমন কমবে। ইতালির বেলেগোনায় যদি সব উপযুক্ত সমতল ছাদ নগর কৃষির জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে সেসব ছাদ থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টন শাকসবজি উৎপাদিত হবে, যা সে শহরের স্থানীয় বাসিন্দাদের সবজি চাহিদার ৭৭ শতাংশ মেটাবে এবং প্রতিবছর আনুমানিক ৬২৪ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষিত হবে। মন্ট্রিয়লের লুফা ফার্মস ছাদে ২৫টির বেশি সবজি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা হয়, যা প্রায় এক হাজার লোকের সবজি চাহিদা পূরণ করে। তেমনি ব্রুকলিন নেভি ইয়ার্ডের খামারটি বছরে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড জৈব পদ্ধতিতে ফলানো সবজি উৎপাদন করে। এরূপ অসংখ্য উদাহরণ এখন আমাদের কাছে চলে এসেছে।
বিশ্বের অন্যতম দ্রুত সম্প্রসারণশীল শহর হলো আমাদের ঢাকা। দিন দিনই এ শহরের আয়তন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে চাষ এলাকা ও সবুজ আচ্ছাদন। স্থানীয়ভাবে উত্তম কৃষিচর্চা বা সুকৃষির দ্বারা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে পারলে তা শহরবাসীর জন্য তাজা শাকসবজি ও খাদ্যের জোগান দিতে সহায়ক হতে পারে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বেশির ভাগ ছাদই চাষাবাদের উপযোগী। কিছু কিছু ছাদের হয়তো সামান্য কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। ধারণা করা হয়, ঢাকা শহরের ছাদ এলাকা প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির সমান। এই বৃহৎ পরিসরকে চাষাবাদের আওতায় আনতে পারলে নগরবাসীর সবজি চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে।
ঢাকা শহরে সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে বিশ শতকের আশির দশক থেকে শখের বাগান হিসেবে ছাদবাগানের যাত্রা শুরু হয়। ২০১০ সালের পর থেকে এর দ্রুত উত্থান ঘটে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় এ প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। লকডাউনের সময় বাসায় আটকে থেকে অনেকেই ছাদবাগান করা শুরু করেন। খাদ্য অনিরাপদ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে অনেকেই ছাদে বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করতে যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে একজন মানুষের জন্য রোজ ৫৫০ লিটার অক্সিজেন লাগে, যা তিনটি বৃক্ষ দিতে পারে। অথচ ঢাকা শহরে আমরা যারা বাস করি তাদের প্রতি ২৮ জনের জন্য আছে মাত্র একটি গাছ। এ শহর জঙ্গলে ভরে যাচ্ছে, তবে তা গাছের না—ইমারতের।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শিক্ষার্থী মাইসা তাসলিম ওয়াসি তাঁর ছাদবাগানের ওপর করা গবেষণা থিসিসে লিখেছেন, ঢাকা শহরের প্রায় ১০ হাজার হেক্টরের সমান আয়তনের ছাদকে বাগান করার আওতায় আনার সুযোগ আছে, যা থেকে উৎপাদিত শাকসবজি ঢাকাবাসীর সবজি চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাদ রয়েছে, যার আয়তন ৪৫০০ হেক্টরের বেশি। এসব ছাদের অধিকাংশই অব্যবহৃত, মানে ছাদবাগান নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ঢাকা শহরে প্রায় ১৫০০ তালিকাভুক্ত ছাদবাগানি রয়েছে। তালিকা ছাড়া ও বিভিন্ন বেসরকারি সূত্র থেকে জানা গেছে, আনুমানিক ৩০ হাজার ছাদবাগান রয়েছে ঢাকা শহরে, যা মোট ছাদের প্রায় ৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। বাকি ৯৩ শতাংশ ছাদ খালি পড়ে আছে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপকৃত কিছু এলাকা যেমন ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মহাখালী ডিওএইচএস ও উত্তরার প্রায় ৩৬.৪ শতাংশ ভবনে কোনো না কোনো ধরনের ছাদবাগান রয়েছে। এ হিসাব থেকেই বোঝা যায় আমাদের ছাদবাগানের বর্তমান চিত্রটি কী। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলতে পারে শহরগুলোতে ছাদবাগান সৃজনের মাধ্যমে। তাতে নিঃসন্দেহে দেশের শহরগুলোয় সবুজ চাদর বাড়বে। এ ব্যাপারে সঠিক সমীক্ষা ও পদক্ষেপ দরকার। শহরের ভবন বাসিন্দাদেরও এগিয়ে আসা উচিত। সরকার এটি নিশ্চিত করার জন্য ছাদবাগানিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক