হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে

জাহীদ রেজা নূর

মিক জ্যাগার ও পল ম্যাককার্টনি—দুজনের নতুন অ্যালবামই পশ্চিমা সংগীতজগতে এ বছর আলোড়ন তুলেছে

রাজনীতি থেকে দূরে থাকি আজ। সংস্কৃতির কোল ঘেঁষে বসি।

শ্রাবণের মেঘগুলো আকাশে জড়ো হোক বা না হোক, এক প্রধান শিক্ষিকা কয়েক সেকেন্ডের এক ভিডিও করে বুঝিয়ে দিয়েছেন সংস্কৃতির শক্তিমত্তাকে। পুরোনো এই গানটি যেন হয়ে উঠল পুনর্জাগরণের বার্তা! তেমনি পশ্চিমা সংগীতের দুই প্রাচীন মানুষের গল্প বলব আজ। এমন দুজনের কথা, তারুণ্য যাঁদের লুফে নিয়েছে।

মিক জ্যাগারকে এই তো সেদিন কোথায় যেন এক ঝলক দেখলাম! বেশিক্ষণ ভাবতে হলো না। স্মৃতিও হাতড়াতে হলো না বেশিক্ষণ। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ যুদ্ধের মাঠেই ক্যামেরাটা একবার ঘুরে এসেছিল তাঁর মুখের কাছ থেকে। সেই মিক জ্যাগার, সেই রোলিং স্টোনস...সেই অতীত রোমন্থন...

ব্যাপারটা যদি শুধু অতীত রোমন্থনের হতো, তাহলে নিশ্চয়ই এতটা আয়েশ করে মিক জ্যাগারের কথা লিখতে বসতাম না। তরুণ প্রজন্ম কি এখনো সেই ষাটের দশকে পড়ে থাকবে? এরই মধ্যে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেছে, মিসিসিপি-ভলগা-নিল-সেনও তাদের মতো করেই প্রবাহিত হচ্ছে, কিছুই আর আগের জায়গায় নেই। তাই সে সময়ের এই যুবক মিক জ্যাগারকে নিয়ে কে আর মাতামাতি করবে? কিন্তু যখন মিক জ্যাগারের সঙ্গে তাঁদের ‘জানি দুশমন’ বিটলসের পল ম্যাককার্টনির কথাও বলা হবে, তখন নিশ্চয়ই তরুণ পাঠকেরা জানতে চাইবে, লেখকের মতলবটা কী?

মতলব আছে। ২০২৬ সালে মিক জ্যাগার আর পল ম্যাককার্টনির মতো পুরোনো শিল্পীদের কথা বলা হচ্ছে তাঁদের কাজের কথা স্মরণে রেখেই। হ্যাঁ, এই বছরেই এই দুজনকে দেখা গেছে নতুন অ্যালবাম নিয়ে আসতে এবং তা পশ্চিমা সংগীতজগতে যারপরনাই আলোড়ন তুলেছে।

যাঁরা পশ্চিমা সংগীতের খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের বরাত দিয়ে বলি, শুভ্রকেশী হার্ড রক ব্যান্ড ‘ডিপ পার্পল’ এবং প্রগ্রেসিভ রক কিংবদন্তি ‘ইয়েস’ প্রকাশ করেছে তাদের নতুন পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম। ম্যাডোনাও একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রকাশিত তাঁর একটি অ্যালবামের সিকুয়েল দিয়ে শ্রোতাদের চমকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও মুগ্ধতা দুই জীবন্ত কিংবদন্তি—পল ম্যাককার্টনি আর মিক জ্যাগার। পল নিয়ে এসেছেন তাঁর উনিশতম একক অ্যালবাম ‘দ্য বয়েজ অব ডানজেন লেইন’। হ্যাঁ, লিভারপুলের সেই গলিটি নিয়েই গানটি, যা বিটলস নামে পরিচিত এক অবিশ্বাস্য ছোকরা চতুষ্টয়কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে। আর বিটলসের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যান্ড ‘রোলিং স্টোনস’ প্রায় একই সময়ে নিয়ে এসেছে তাদের নতুন স্টুডিও অ্যালবাম ‘ফরেইন টাঙ্স’।

২ . কিছুদিন আগের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিবিএস’-এ প্রচারিত হতো ‘দি লেটনাইট শো উইথ স্টিফেন কোলবার্ট’। বহুদিন ধরে চলেছে সে অনুষ্ঠান। কিন্তু এ বছরের ২১ মে বন্ধ হয়ে গেল তা। বলা ভালো, বন্ধ করে দেওয়া হলো। প্রকাশ্যে জানানো হলো, অনুষ্ঠানটি আর দর্শক টানতে পারছে না। পুঁজিবাদী দেশে লাভজনক না হলে যেকোনো কিছুই তো ছুড়ে ফেলা হয়। সেভাবেই ছুড়ে ফেলা হলো ‘স্টিফেন কোলবার্ট শো’কে।

কিন্তু যাঁরা ভেতরের খবর রাখেন, তাঁরা জানেন, লাভজনক আর লোকসানের প্রসঙ্গই এখানে নেই। মূলত রাজনীতির খবরাখবর থেকে দূরে থাকা দর্শকেরাও জানতেন যে স্টিফেন কোলবার্ট বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের একজন প্রকাশ্য সমালোচক। তাঁর ব্যঙ্গাত্মক একক বক্তৃতায় তিনি বহুবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কড়া সমালোচনা ও বিদ্রূপ করেছেন। গুঞ্জন রয়েছে, উপস্থাপকের এই রাজনৈতিক অবস্থানই ছিল অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার প্রকৃত কারণ।

শুধু অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব বলেই শেষ দিনের অনুষ্ঠানটি অসংখ্য মানুষের মনে দাগ কাটেনি। টেলিভিশন স্টুডিওটি ছিল নিউইয়র্কের বিখ্যাত ‘এড সালিভান থিয়েটার’-এ, যেখানে যুগে যুগে অসংখ্য জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের চিত্রায়ণ হয়েছে। ১৯৬৪ সালে এই থিয়েটারের স্বত্বাধিকারী এড সালিভান ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ‘দ্য বিটলস’কে তাঁর মঞ্চে মাত্র একবার এবং অল্প সময়ের জন্যই পারফর্ম করার সুযোগ দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিভারপুলের চার তরুণের সেই মাত্র ১৫ মিনিটের পরিবেশনাই টেলিভিশনের ইতিহাসে এক রেকর্ড গড়ে তোলে—অনুষ্ঠানটি দেখেছিলেন ৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি দর্শক!

পরে ‘দ্য বিটলস’ আরও দুবার এড সালিভানের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশ নেয়। আর স্বয়ং এড সালিভান কিংবদন্তিতুল্য ‘শেইয়া স্টেডিয়াম’-এ অনুষ্ঠিত ব্যান্ডটির ঐতিহাসিক কনসার্টে ঘোষক (কনফারেন্সিয়ে) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তত দিনে ‘বিটলম্যানিয়া’ সারা বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছিল। স্টিফেন কোলবার্টের শেষ অনুষ্ঠানটিও বিপুল দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, তবে শুধু বিদায়ী পর্ব হওয়ার কারণে নয়। সেদিন সন্ধ্যায় এড সালিভান থিয়েটারের সেই ঐতিহাসিক মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন পল ম্যাককার্টনি।

৩. কী আছে পল ম্যাককার্টনির নতুন এই অ্যালবামে? অ্যালবামের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণা—শিরোনাম গান ‘ডানজেন লেইন’ থেকেই সেই ইঙ্গিত মেলে; এটি লিভারপুলের সেই রাস্তার নামের প্রতি ইঙ্গিত করে, যেখানে ভবিষ্যতের ‘বিটল’ সদস্যরা বেড়ে উঠেছিলেন। এখানে রয়েছে রিঙ্গো স্টারের সঙ্গে তাঁর দ্বৈত গান ‘হোম টু আস’ এবং বেশ কয়েকটি হৃদয়স্পর্শী ব্যালাড। তবে পুরো অ্যালবামটি নস্টালজিয়ায় মোড়া, এ রকম ভাবা যাবে না। ‘অ্যাজ ইউ লাই দেয়ার’, ‘মাউনটেইন টপ’ এবং ‘কাম ইনসাইড’ গানগুলো শুনলে সেই ৫০ বছর আগের পল ম্যাককার্টনিকেই পাওয়া যাবে। ম্যাককার্টনি এখনো যথেষ্ট প্রাণবন্ত থাকলেও তাঁর নতুন অ্যালবামে অতীত দিনের জন্য বিষণ্নতা ও হালকা বেদনার আবহ রয়েছে অ্যালবামজুড়ে, এ কথা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, বিটলস ছিল এক অবিশ্বাস্য জোট। এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। চারজন মিলে তাঁরা সংগীতে একাকার হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু আলাদাভাবে তাঁদের প্রত্যেকের সংগীতের ভাষা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে কথা বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর প্রমাণ পেয়েছে তাঁদের ভক্তরা।

৪. আর যাঁর কথা আলাদাভাবে বলতে হয়, তিনি হলেন এই অ্যালবামের প্রযোজক অ্যান্ড্রু ওয়াট। সংগীতের এই বিস্ময়বালক মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই কাজ করেছেন অজি অসবোর্ন, এডি ভেডার, এলটন জন, ইগি পপসহ রক অ্যান্ড রোলের বহু মহাতারকার সঙ্গে। আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গান রচনা করছে আর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম সংগীতের রুচি নির্ধারণ করছে, তখন এই ধরনের প্রযোজকেরাই হয়ে উঠছেন জীবন্ত সংগীতের প্রকৃত রক্ষক। কারণ, এ গ্রীষ্মেই অ্যান্ড্রু ওয়াট আরেক দল সংগীত-দানবের প্রকল্পেও পূর্ণাঙ্গ সহ-স্রষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন। কারা তারা? তারা হলো, ‘দ্য বিটলস’-এর প্রতিদ্বন্দ্বীরা—আপনি নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, আমরা ‘দি রোলিং স্টোনস’-এর কথা বলছি। আগেই বলেছি, তাদের অ্যালবামটির নাম ‘ফরেইন টাঙ্স’।

এই অ্যালবামটিও খুব গোছানো। ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার কোনো চেষ্টা এতে নেই। বহুদিন পর মিক জ্যাগার ও তাঁর সঙ্গীরা ভক্তদের এমন মানসম্পন্ন সংগীত উপহার দিলেন।

এই অ্যালবামে যেমন রয়েছে নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার মতো গান, তেমনি রয়েছে কিছু প্রশ্ন জাগানো ট্র্যাকও। এর মধ্যে আছে অ্যামি ওয়াইনহাউসের ‘ইউ নো আই অ্যাম নট গুড’-এর নতুন সংস্করণ। কিন্তু পুরো অ্যালবামটিকে একসঙ্গে বিচার করলে গানটির উপস্থিতিকে বেশ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কারণ, এই গানটি ‘দ্য রোলিং স্টোনস’-এর সেই সোনালি ব্লুজ-যুগের প্রতি ইঙ্গিত করে এবং অ্যালবামটির রক অ্যান্ড রোল চরিত্রকে ধরে রাখে। আরেকটি বিষয় না বললে কি চলবে?

পল ম্যাককার্টনি এবং দি রোলিং স্টোনস-এর নতুন অ্যালবাম দুটিকে শুধু অ্যান্ড্রু ওয়াটের কাজই একসূত্রে গাঁথেনি, এই দুই প্রকল্পের চারপাশেই গড়ে উঠেছে এমন একদল সংগীতশিল্পীর সমাবেশ, যাঁদের আজ রক সংগীতের অভিজাত বৃত্তের প্রতিনিধি বলা যায়। দি রোলিং স্টোনসের অ্যালবামের কয়েকটি গানে বেজ গিটার বাজিয়েছেন স্বয়ং ম্যাককার্টনি—যখন পথেই দেখা হয়ে গেল, তখন বহুদিনের প্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটু সাহায্য করতেইবা আপত্তি কোথায়! এ ছাড়া ‘ফরেইন টাঙ্স’-এ গিটার বাজিয়েছেন ‘দ্য কিউর’-এর প্রধান শিল্পী রবার্ট স্মিথ, ড্রাম বাজিয়েছেন ‘রেড হট চিলি পেপারস’-এর চ্যাড স্মিথ, আর কাউবেল বাজিয়েছেন ব্রুনো মার্স।

ম্যাককার্টনি এবং দি রোলিং স্টোনস এবার বিশাল বিশ্বভ্রমণ কনসার্ট সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন না; বরং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যুতে বড় বড় একক কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। সম্ভবত এ কারণেই তাঁদের মিউজিক ভিডিওগুলোর ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এই প্রবীণ শিল্পীরা আর নিজেরা ক্যামেরার সামনে আসতে আগ্রহী নন, কিংবা নিজেদের তরুণ বয়সের ডিপফেক সংস্করণের আড়ালেও লুকোতে চান না। বরং তাঁরা নাচ, অ্যানিমেশন কিংবা সরল লিরিক ভিডিও, অর্থাৎ গানের কথাকে দৃশ্যরূপ দেওয়া ভিডিওকেই সামনে নিয়ে আসছেন।

এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, স্যার পল কিংবা মিক জ্যাগার ও তাঁর সঙ্গীরা ব্যর্থ অ্যালবাম প্রকাশ করে, কিংবা সংগীতের পরিবর্তে নীরবতা উপহার দিয়ে, অস্তগামী সূর্যের পথে হেঁটে চলে যাওয়ার কথা মোটেই ভাবছেন না। যত দিন থাকবেন, সংগীতসাধনা করেই টিকে থাকবেন।

তরুণ প্রজন্মকে কোন রহস্য দিয়ে তাঁরা কাছে টানছেন, সেটাই হতে পারে গবেষণার বিষয়।

বেলুচিস্তানের তথাকথিত স্বাধীনতার আন্দোলন আদৌ কি বাস্তবসম্মত

কুইক রেন্টালের ছায়া কি এবারও বিদ্যুতে

সভ্যতার দ্বিমুখী যাত্রা

জলীয় চরিত্রের রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশিত বিদায়

আগামীর সবুজ বাংলাদেশ

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায়

সভ্যতার অভিশাপ শিশুশ্রম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়িত্বশীলতার নতুন চ্যালেঞ্জ

সব জন-আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি: সৈয়দ নিজার

বিশ্বজুড়ে লবণাক্ত জলাভূমি যখন সংকটের মুখে