হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভবদহের জলাবদ্ধতার সমাধান যে উপায়ে

এম আর খায়রুল উমাম

যশোরের দুঃখ ভবদহ—কথাটি আর মিথ্যা নয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

যশোরের দুঃখ ভবদহ—কথাটি আর মিথ্যা নয়। যশোর ও খুলনার ৩৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ১০ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার নাম ভবদহ। এ এলাকার জনগণের জীবন বাঁচানোর জন্য যে আন্দোলন-সংগ্রাম চলমান রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যার সমাধানের নামে ১৯৯০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নেওয়া ২১টি প্রকল্পের ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু গৃহীত কোনো প্রকল্পই এ পর্যন্ত ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসন করতে পারেনি।

১৯৮২ সাল থেকেই ভবদহ এলাকার বিলগুলো ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে। সেই পানি ফসলের খেত, হাটবাজার, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের বসতবাড়িতে উঠে আসে। ফলে কয়েক শ গ্রামের মানুষ স্থায়ী জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকা পড়ে যায়।

এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে, অনেকেই সন্তানের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেন। সামর্থ্যবানেরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে শুরু করেছেন। আর যাঁরা থাকতে বাধ্য হন, তাঁরা জীবিকা পরিবর্তন করে বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রামে লিপ্ত হন। সমগ্র যশোরবাসী এই বিশাল জলাবদ্ধতাকে দুঃখ হিসেবে গ্রহণ করে এ থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন, যা আজও চলমান।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিষয়টিতে সরকারের দৃষ্টি পড়লে এরপর একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব কোনো প্রকল্পই আজ পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারেনি।

মূলত প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে অচল করে দেওয়ার কারণে এ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশে ১৯৫৭ সালে জাতিসংঘের অধীনে গঠিত ক্রুগ মিশন এ অঞ্চলে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে কিছু সুপারিশ প্রদান করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে এ অঞ্চলের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদেশি পরামর্শক দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তবে সেই পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক পরিস্থিতি, মানুষের জীবনযাত্রার পদ্ধতি ও সংস্কৃতি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

তবে বিদেশিদের পরিকল্পনার প্রতি সরকারের প্রবল আগ্রহ এটার বাস্তবায়নের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাঁধ তৈরি করা হয়, অনেক ছোট স্লুইসগেট তৈরি করে নদীর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রকৃতির নিজস্ব চলার পথে সব রকম বাধা সৃষ্টি করা হয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্যা থেকে রক্ষা পেয়ে এলাকার মানুষ খুশি হয়। এলাকার মানুষের ভাগ্যে এ সুখ সহ্য হয় মাত্র ১০-১২ বছর। এর পর থেকেই কৃষকের হাসি ম্লান হতে শুরু করে। প্রকল্পের আশীর্বাদে স্লুইসগেটে জোয়ারের পানি বাধাগ্রস্ত হয়ে পলিমাটি নদীর তলদেশে জমতে শুরু করে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হওয়ার একপর্যায়ে ১৯৮২ সালে মনিরামপুরের নেহালপুরে শুরু হয় জলাবদ্ধতা ও ক্রমান্বয়ে এর বিস্তার ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা এখন ভবদহ জলাবদ্ধতার সমাধান হিসেবে টিআরএম বা জোয়ারাধারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তা দিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। শুধু রাষ্ট্রের টাকা গচ্চা যাচ্ছে। তবে স্থানীয় মানুষেরা মনে করে, মুক্তেশ্বরী, হরি, শ্রী, আপার ভদ্রা, তেলগাতি, গ্যাংরাইলসহ সব সংযুক্ত নদ-নদীর অবৈধ দখল মুক্ত করে প্রকৃত মাপ ধরে নদ-নদীগুলোকে এমনভাবে খনন করতে হবে, যাতে পানি দ্রুত নেমে যায়। পাশাপাশি সব সংযুক্ত শাখা, উপনদী ও খালের সংযোগ উন্মুক্ত করতে হবে। সেতুবিহীন আড়াআড়ি সড়কে সেতু নির্মাণ করতে হবে, প্রয়োজনে স্লুইসগেট তুলে দিয়ে নদীর প্রকৃত প্রস্থ অনুযায়ী পানিপ্রবাহ সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সাধারণ মানুষের সামগ্রিক সুপারিশগুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ‘টিআরএম’ শব্দটিকে আশ্বাস হিসেবে ব্যবহার করছে কি না বোঝা কষ্টকর। কারণ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০০২ সালে নেহালপুর ইউনিয়নের বিল কেদারিয়ায় টিআরএম চালু করেছিল, কিন্তু নানা জটিলতায় তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময়ের পরও সাফল্যের মুখ দেখেনি। ফলে এই বিল কেদারিয়া হয়ে যে ২৭ বিলের পানি মুক্তেশ্বরী, টেকা নদী হয়ে সাগরে পড়ত, তা মৃত স্লুইসগেটের কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

বর্তমান সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে ভবদহ স্লুইসগেটের ওপর বৈদ্যুতিক সেচযন্ত্র দিয়ে পানি সরানোর কাজ চলমান আছে। পাশাপাশি হরি নদের কিছু অংশ খননের কাজ করা হচ্ছে। আরও কিছু সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু চলমান কাজগুলোকে এলাকাবাসীর জন্য সান্ত্বনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। মূল সমস্যার সমাধান এতে হবে না।

সে পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৯৬ সালে সরকার ২২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহ্যাবিলিটেশন প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। বিদেশি পরামর্শে গৃহীত এ প্রকল্প জলাবদ্ধতাকে আরও জটিল ও বিস্তার করবে—এরূপ বিশ্লেষণের পর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) নিজ উদ্যোগে এক সমীক্ষা পরিচালনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে। আইডিইবির চূড়ান্ত সুপারিশ ছিল ‘তিন নদীর পাড়ে তিনটা এক হাজার কিউসেক পাম্প বসিয়ে পানি বের করে ফেলা। এই পাম্প প্রয়োজনে পানি বের করে দেবে আর ঢুকাতেও পারবে। জলাবদ্ধ এলাকার বিপুল পরিমাণ পানি বের করতে যে চাপ সৃষ্টি হবে, তাতে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পাবে, খননের কাজটা করতে হবে না। প্রাথমিকভাবে জলাবদ্ধ এলাকার সব পানিপ্রবাহ উন্মুক্ত করতে হবে।’ তৎকালীন সময়ে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প আমাদের দেশে গ্রহণ করা খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু এরপরে কোনো সরকারই আইডিইবির দেওয়া প্রস্তাবকে আমলে নেয়নি। আমরা আশা করব, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকার এ প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রয়োজনে নতুন করে এই সমীক্ষার বাস্তবতা পরীক্ষা করতে পারে। ভবদহের সমস্যা সমাধানে বিদেশি অনেক প্রকল্প তো গ্রহণ করা হলো, এবার দেশি প্রকল্পটিকে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনার অনুরোধ করছি।

আশার কথা এই যে চলমান আন্দোলনকারী তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা দশকের পর দশক ডুবে থাকা মানুষের মুক্তিতে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেই ক্ষ্যান্ত হননি, তাঁরা শপথ নিয়েছেন, সমস্যার সমাধান করে তবেই বাড়ি ফিরবেন। আন্দোলনকারীদের এমন ঘোষণা জলাবদ্ধ মানুষকে আশার আলো দেখাচ্ছে। যশোরের সর্বস্তরের মানুষ কায়মনোবাক্যে চায় প্রকৃতির অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে।

এম আর খায়রুল উমাম

প্রাবন্ধিক ও সাবেক সভাপতি, আইডিইবি

ইরান যুদ্ধ এবং দেশের সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ

‘আমরা’ আর ‘ওরা’র ঐতিহ্য কি চালু থাকবে

মীমরা হয়ে উঠুক বাবা ও মায়ের ‘চোখের হারাই’

নেপালে তরুণদের জয় যে বার্তা দিচ্ছে

বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব

সাংবাদিকতার শিক্ষাগুরু

ক্ষমতার দৌরাত্ম্যের বাস্তবতা

৮৫ সেকেন্ডের হাহাকারে বিপন্ন পৃথিবী

নেপালের নির্বাচন: জেন-জি ঝড়ে উড়ে গেল পুরোনো নেতৃত্ব

সহজ কৃষিঋণ ও দক্ষ কৃষক চাই