ভারতে একসময় বামপন্থীদের অবস্থা ছিল রমরমা। যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় তারা কোনো দিনই আসেনি। তবে দেশটির জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ছিল অনেক। কিন্তু সেই প্রভাব এখন ক্ষয়িষ্ণু। বামপন্থী রাজনীতির অবস্থা এতটাই নাজেহাল যে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের হাতে থাকা শেষ রাজ্য, কেরালাও হাতছাড়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পর এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যেই আর বামেরা ক্ষমতায় থাকছে না।
সমতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বামপন্থী রাজনীতির এই করুণ হাল নিয়ে অবশ্যই গবেষণা হতে পারে। একসময় সোভিয়েত প্রভাবে যে বামপন্থার উত্থান ঘটেছিল, পুঁজিবাদী মতাদর্শকে তারা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, সেই বামপন্থার এমন করুণ দশার মধ্যে অবশ্যই কারণ রয়েছে।
ভারতের বামপন্থা রাজনীতির ইতিহাস ও বর্তমান করুণ দশা নিয়ে আলোচনার আগে এই আদর্শের রাজনীতির বৈশ্বিক দুটি ধারা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। একটি মস্কোপন্থী আরেকটি হলো চীনপন্থী ধারা। মস্কোপন্থী বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী বামধারার রাজনীতি এখন আর নেই বললেই চলে। পুঁজিবাদের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে ১৯৯০ সালেই। তবে এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে চীনপন্থী বামধারা।
মস্কোপন্থী বামধারার আদর্শের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল পুঁজিবাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাওয়া। যেভাবে ব্যক্তিমাত্রই পুঁজির প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকে, সেখানে সমাজে সমতা সৃষ্টির নামে আয়সীমা ও সম্পদের সীমা নির্দিষ্ট করা, সম্পদ জাতীয়করণ, যৌথ খামার উদ্যোগ ব্যক্তির সম্পদ অর্জনের স্পৃহার সঙ্গে পুরোদমে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে পার্টি নেতৃত্বের আমলাতান্ত্রিকতা এবং চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতিও তাদের পতনের কারণ বলে অভিযোগ আছে। ফলে মস্কোপন্থী বামধারা পুঁজিবাদের কাছে হেরে গেছে।
তবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এ ক্ষেত্রে দারুণ একটি পথ অনুসরণ করেছে। তারা বামধারার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। ফলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েনি।
এবার আসা যাক, ভারতে বামধারার রাজনীতির আলোচনায়। ভারতসহ পুরো উপমহাদেশেই বামপন্থা রাজনীতিতে রুশ ও চীনপন্থী ধারা এখনো রয়ে গেছে। যদিও আদর্শিক জায়গায় তারা কতটা এই দুই ধারায় অটল রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে এটুকু নিশ্চিত, ভারতে দুই ধারার বামপন্থারই অবস্থান এখন জনমানুষ থেকে অনেক দূরে। তারা তাত্ত্বিকভাবে এখনো সমতার স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু সুযোগ পাওয়ার পর তার বাস্তব প্রয়োগ তারা কতটুকু রাখতে পেরেছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ভারতে বামপন্থার রাজনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তারা সুযোগ পেয়েছে। পুরো ভারতকে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আর পারেনি। বরং জনতার পছন্দের জায়গা থেকে দিনে দিনে সরে গেছে। তাদের অবস্থা এখন এতটাই নাজুক যে, কোনো রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা তো দূরের কথা, জোটসঙ্গী হয়ে ক্ষমতার সুবাতাস পেতে দর-কষাকষির অবস্থানেও নেই তারা।
ভারতে বামপন্থী রাজনীতির উত্থানের সূচনা ষাটের দশকের শেষ দিকে। ১৯৫৭ সালে কেরালায় বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইলামকুলাম নানাক্কাল শঙ্করান নামবুদিরিপাড়ের হাত ধরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) ক্ষমতায় আসে। তবে এর আগেই ১৯৫৫ সালে পাত্তোম এ. থানু পিল্লাইয়ের হাত ধরে প্রজা সমাজতন্ত্রী পার্টি ক্ষমতায় এসে বুঝিয়ে দেয়, কেরালায় বামপন্থী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এরপর নামবুদিরিপাড় তো বামের রাজত্বই প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রায় সাত দশক ধরে এই রাজ্য কখনো কংগ্রেস, কখনো কমিউনিস্ট পার্টি শাসন করেছে। সর্বশেষ পিনারাই ভিজয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি দুই মেয়াদে কেরালায় ক্ষমতায় ছিল। এবার তারা ধরাশায়ী হয়েছে কংগ্রেস জোটের কাছে।
কেরালায় সরকার গঠনের পর ভারতজুড়ে বামপন্থীদের প্রভাব বাড়তে থাকে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের টানা শাসন শুরু হয়। ত্রিপুরায় বামের পতাকা ওড়ে ১৯৯৩ সালে। এরপরই যেন কী হয়ে গেল। বামদের প্রভাব কমতে থাকে, জনমানুষের মন থেকে মুছে যেতে শুরু করে তারা। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস বামদের হটিয়ে সরকারে আসে। এর মাধ্যমে এই রাজ্যে শেষ হয় বামদের টানা ৩৪ বছরের শাসন। ২০১৮ সালে ত্রিপুরাও হাতছাড়া হয় বামদের। আর এবার হাতছাড়া হলো শেষ দুর্গ, কেরালা।
বামদের এই দুরবস্থার কারণ চিহ্নিত করা এখন নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। মোটাদাগে এটুকু বলে দেওয়া যায়, বামেরা ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারই প্রতিফলন হলো এ ফলাফল। তবে ভারতের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও মনো-সামাজিক বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ সফলভাবে ভারতজুড়ে তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। বামদের পতনে এটাও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকতে পারে। তবে এটাই যে বড় কারণ, সেটা বলা যাবে না। কারণ, এই রাজ্যের প্রতিবেশী তামিলনাড়ুতে কিন্তু ঘটেছে অনেকটা উল্টো ঘটনা। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ সেখানে খুব একটা পাত্তা পায়নি। বরং অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া থালাপতি বিজয় রেকর্ড গড়েছেন। যদিও ক্ষমতায় যাওয়ার পথ এখনো তাঁর পোক্ত নয়। পাঁচ দশক আগে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া মারুথুর গোপালান রামাচন্দ্রনের হাত ধরে ১৯৭৭ সালে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে) ক্ষমতায় এসেছিল। দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ভেঙে তিনিই এআইএডিএমকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর এবার থালাপতি বিজয়ের গড়া দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই জিতে নিয়েছে ১০৮টি আসন। অপরদিকে ডিএমকের নেতৃত্বাধীন এসপিএ জোট পেয়েছে ৭৩টি এবং এআইএডিএমকের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। সরকার গঠনের জন্য থালাপতির দলের দরকার ছিল ন্যূনতম ১১৮টি আসন। কাজেই ক্ষমতায় যেতে তাঁকে অবশ্যই হয় ডিএমকে অথবা এআইএডিএমকের সঙ্গে আপসরফায় যেতে হবে। আর যদি ডিএমকে আর এআইএডিএমকে জোট করে ফেলে, তাহলে হয়তো এখনকার হিসাব পাল্টে যাবে।
সে অন্য কথা। কিন্তু তামিলনাড়ুর যে তিনটি দল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তারা সবাই কিন্তু বামঘেঁষা। যদিও কেউই পুরোমাত্রায় বাম নয়। তারপরও সেখানে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। অবশ্য যেভাবে ভারতের রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির জয়রথ চলছে, তাতে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে তামিলনাড়ুতেও বিজেপি সরকার দেখা যাবে। সে ভিন্ন কথা। মূল প্রসঙ্গ হলো, বামেরা আর ভারতের কোনো সরকারেই নেই। এই না থাকাটাই বড় অশনিসংকেত তাদের জন্য। কারণ, কেরালা বাদে বাকি যে দুই রাজ্য বামেদের ছিল, সেখানে দীর্ঘদিন শাসন করার পর তারা বলতে গেলে ক্ষমতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কেরালা ভিন্ন। এখানে বারবার কংগ্রেস আর বামেরা ক্ষমতায় এসেছে। যদি রাজনীতিটা ঠিকঠাক এবার গুছিয়ে নিতে পারে বামেরা, তাহলে হয়তো পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনের পর আবার কেরালায় বাম সরকার দেখা যেতে পারে। কিন্তু রাজনীতি গোছাতে না পারলে, জনঘনিষ্ঠতা বাড়াতে না পারলে ভারত থেকে বামদের মুছে যাওয়ার দিন আর বেশি নেই।
লেখক: উপ বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা