হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সাতসকালেই কোন দুর্দিনের পূর্বাভাস

আজাদুর রহমান চন্দন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার প্রথম ধাপ হিসেবে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের পথচলার ইতি টেনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন নির্বাচিত সরকারও দুই মাসে পা রাখতে যাচ্ছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান। এর আগে সকাল ১০টায় সংসদ ভবনের নিচতলায় অবস্থিত শপথকক্ষে দুই ভাগে শপথ নিয়েছিলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার খবরে দেশের সংবাদমাধ্যমে কত রকমের বিশেষণই না ব্যবহৃত হয়েছিল! তুলে ধরা হয়েছিল কতই না আশাবাদ! নতুন সরকার গঠনের পর কয়েক দিন সরকারপ্রধানের ট্রাফিক নিয়ম মেনে অফিসে যাতায়াত এবং সকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই এমনকি ছুটির দিনেও অফিসে যাওয়া ইত্যাদি কিছু ঘটনার লাইভ টেলিকাস্টও হয়েছে। আমাদের তখন মনেও পড়েনি আশির দশকে এক সামরিক স্বৈরশাসকের সাইকেল চালিয়ে অফিসে যাওয়ার দৃশ্যের কথা।

সরকার গড়ার ১০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে ছয়জন পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। গত ১৪ মার্চ আরও পাঁচ সিটি করপোরেশনে নিয়োগ দেওয়া হয় নতুন প্রশাসক, যাঁদের সবাই বিএনপির নেতা। এর পরদিন অর্থাৎ ১৫ মার্চ দেশের ৪২ জেলা পরিষদেও নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নিয়োগ পাওয়া এই প্রশাসকদের মধ্যে অন্তত আটজন আছেন, যাঁরা বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁদের কেউ দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, কেউ কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবং অন্যরাও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। ৩১ মার্চ আরও ১৪ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরাও সবাই দলীয় নেতা। প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে সংসদে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, সদ্য গঠিত বিএনপি সরকার এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শুরুতেই জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

জুলাই আন্দোলনে জন-আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা, আন্দোলনকালীন হত্যাকাণ্ডের বিচার করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়া। হত্যাকাণ্ডের বিচার অনেক দূর এগিয়েছে নির্বাচনের আগেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার প্রথম ধাপ হিসেবে। পরবর্তী ধাপে জনগণের প্রত্যাশা হলো—স্থানীয় সরকারে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন। সংস্কারের মূলে যদিও বড় আঘাত করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকারই। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি, বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য সেই সরকার ১১টি কমিশন গঠন করেছিল। এসবের মধ্যে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পরপরই এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয় হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মতান্ত্রিক কিছু দল ও সংগঠন। তারা শুধু প্রতিবেদন নয়, কমিশনই বাতিল করার দাবি তোলে। অন্তর্বর্তী সরকারও কার্যত তাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে নেয়। ওই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা তো দূরে থাক, কমিশনই অকার্যকর করে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার নিয়েও কোনো আলোচনা শোনা যায়নি। স্বাস্থ্য খাতে একটি জনপ্রিয় কার্যক্রম ছিল সরকারি হাসপাতালে বৈকালিক বিশেষজ্ঞ সেবা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো ঘোষণা ছাড়াই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার সেটি চালু করার কোনো আগ্রহই দেখায়নি। ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পোশাক বদল আর বড় বড় পদে রদবদল ছাড়া পুলিশ বিভাগে আর কোনো সংস্কার কি কারও নজরে পড়ে? গণমাধ্যম সংস্কার বলতেও চর দখলের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও বড় পদগুলো দখল করা ছাড়া কিছুই হয়নি।

বিএনপি সরকার কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে। বিতর্কিত অনেক বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ অনুসরণ করে চললেও ইতিবাচক কিছু বিষয় এড়িয়ে চলছে বিএনপি। সরকারি হাসপাতালে বৈকালিক বিশেষজ্ঞ সেবা পুনরায় চালু করার কোনো আগ্রহ বা ইচ্ছা বিএনপি সরকারের আছে বলে মনে হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) বহির্বিভাগে সকালের চেয়ে বিকেলের বিশেষজ্ঞ সেবাপ্রত্যাশীদের ভিড় থাকে বেশি। সরকারি অন্যান্য হাসপাতালেও আগে তেমন চিত্রই দেখা যেত। আওয়ামী লীগ সরকার চালু করেছিল বলেই কি এটি পরিত্যাজ্য?

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ গত শনিবার থেকে কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর বৈধতা থাকছে না। এর মধ্যে ৭টি অধ্যাদেশ ৪টি বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। গত ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার পর সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে সেগুলো অনুমোদিত না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে আছে গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং রেফারেন্স ও পুলিশ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। সব অধ্যাদেশ পাস করতে না পারায় সরকারের বিরুদ্ধে ঐকমত্য ভঙ্গ ও আস্থার সংকটের অভিযোগ জানিয়েছে সংসদে বিরোধী জোট। এ নিয়ে শুক্রবারের অধিবেশনের শেষের দিকে তারা ওয়াকআউটও করেছে। ধারণা করা যায়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়া কোনো কোনো অধ্যাদেশ নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নতুন বিল হিসেবে বিএনপি হয়তো সংসদে আনবে। তবে সেগুলোতে সরকার ও আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রাধান্য পাবে সন্দেহ নেই।

বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচন এবং শেরপুর-৩ আসনের স্থগিত নির্বাচনে সরকারের ভূমিকাও সুদিনের কোনো আভাস দিতে পারেনি। ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণের পর গণনা শেষে বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা করা হয়। দুটি নির্বাচনেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ওই দুটি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল। জামায়াতে ইসলামী বলছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করেছে। এ নিয়ে তারা রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে। দুই আসনে ভোটে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ করা হয়েছে সংসদেও। দুটি আসনে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন বিরোধী দলের তিনজন সদস্য। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে বিল পাসের আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। দুটি নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, ‘মানুষজন বলছে, ১৯৯৪ সালে ছিল মাগুরা, আজকে হলো বগুড়া। যদি এটা চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বাসের জায়গাটা কোথায় থাকবে?’ এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, উপনির্বাচনে বিরোধীদলীয় এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে ঢুকে তাঁদের আহত করা হয়েছে। ছোট বাচ্চাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ভোট দেওয়ানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশকে আরেকবার সংকটে ফেলা হচ্ছে।

হতেও পারে, বিরোধী দলের অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। তবে সরকার সামগ্রিকভাবে তার কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের মন জিতে নিতে পারলে বিরোধী দলের ভিত্তিহীন অভিযোগ হালে পানি পাবে না। আর সরকার যদি জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী আইন প্রণয়নসহ বিতর্কিত নানা কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে তা হলে কোনো একসময় হয়তো পচা শামুকেও তাদের পা কাটা যেতে পারে।

শেখ হাসিনা চাইলে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে পারতেন। কিন্তু সে পথে তিনি এগোননি। এখন তারেক রহমানের সামনেও তেমন সুযোগ আছে। তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুর আগে একাধিকবার প্রতিহিংসা এড়িয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের পথে এগোতে তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম অনুষ্ঠানে এসে তারেক রহমানও বলেছিলেন, বিএনপি হিংসা, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে চায়। তারেক রহমানের মুখে একাধিকবার ‘প্রতিহিংসা নয়’, ‘শান্তি ও সমঝোতার রাজনীতির’ কথা জনগণকে আশান্বিত করেছিল। কিন্তু তারেক রহমানের দল ও সরকার কি সে পথে হাঁটছে? জুলাই আন্দোলনের পরের সামান্য ইতিবাচক দিকগুলোও পরিহার করে নেতিবাচক পথেই কি বিএনপি এগিয়ে চলছে না?

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

বৈশাখ থাকুক চির সমুজ্জ্বল, চির মঙ্গলময়

টিকার জন্য দায় না দিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া জরুরি: ডা. মুশতাক হোসেন

বৈশাখের অর্থনীতি: আনন্দের আড়ালে সাধারণের জীবন

পয়লা বৈশাখ এবং শিল্প-সমৃদ্ধ ভাবনা

প্রয়োজন প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব

আওয়ামী লীগ, মুজফ্ফর আহমদ ও কালো আইন

ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল: মুক্তির সনদ ঘোষণার দিন

পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি কি এড়াতে পারল বিশ্ব

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রভাব

ইরানের হাতে আর কী অস্ত্র আছে