হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

দক্ষিণ এশিয়ার পানি-রাজনীতি ও এর ভবিষ্যৎ

আব্দুর রহমান 

ফারাক্কা ব্যারাজ সম্ভবত ভারতের প্রথম পানি-আধিপত্যবাদী পদক্ষেপ। ফাইল ছবি

দক্ষিণ এশিয়ায় হাইড্রো-পলিটিকস বা পানি-রাজনীতি এবং হাইড্রো-হেজেমনি বা পানি-আধিপত্য নিয়ে কথা বললেই মূলত তিনটি দেশের নাম আসে। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-ভারত ও পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে একাধিক আন্তসীমান্ত নদী রয়েছে।

আশঙ্কার বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে উজানের দেশ হওয়ার কারণে এসব নদীর বেশির ভাগেরই নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ভারতের হাতে। ফলে, যখন হাইড্রো-পলিটিকস বা হাইড্রো-হেজেমনির আলাপ আসে, তখন স্বভাবতই ভারতের নাম আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে এখানে অবশ্য চীনের বিষয়টিও আমলে নিতে হয়। কারণ, বাংলাদেশে আন্তসীমান্ত নদীগুলো যে পরিমাণ পানি বয়ে আনে, তার বেশির ভাগটাই আসে চীনে উৎপত্তি হওয়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা হয়ে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে সুদূর ভবিষ্যতে পানিকে কেন্দ্র করে সংঘাতও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। পানির ঘাটতি খাদ্যসংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভিবাসন সমস্যা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের মতো বহুমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। এসব সমস্যা এই অঞ্চলে সংঘাতের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

এর ধারাবাহিকতায় বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতাও নিশ্চিতভাবেই দেখা দেবে। কারণ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের তথাকথিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ’ রক্ষায় এবং অন্যদিকে চীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে এখানে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করবে। এই বিষয়গুলোকে আরও জটিল করে তুলছে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যের নিম্নমুখী মান।

দক্ষিণ এশিয়ায় পানি-রাজনীতির বড় অধ্যায় বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার আন্তসীমান্ত নদীগুলো। বিশেষ করে গঙ্গা-পদ্মা পানিবণ্টন চুক্তি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য গঙ্গা চুক্তি ও তিস্তা প্রকল্প জরুরি। কারণ, এই নদী দুটোই দেশের পানিনিরাপত্তা, কৃষি, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ফারাক্কা ব্যারাজ সম্ভবত ভারতের প্রথম পানি-আধিপত্যবাদী পদক্ষেপ। ১৯৭৫ সালে ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা না করেই সীমান্তে এই ব্যারাজ চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল পলি জমা কমিয়ে গঙ্গার পানি ঘুরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সুপেয় পানির চাহিদা মেটানো। এই বাঁধ বাংলাদেশে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটায়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়, যা ভাটিতে পানির ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমানে ফারাক্কা বাঁধ ভারতের নিজের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যে তীব্র বন্যার সৃষ্টি করছে এবং একই সঙ্গে ভাটির বাংলাদেশে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে।

তারপরও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গঙ্গা এবং তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করেছে। এমনকি ভারতে মূল গঙ্গা নদীর ওপরও একাধিক বাঁধ বা ব্যারাজ আছে, যেগুলো দিয়ে পানি বাংলাদেশে প্রবেশের অনেক আগেই প্রত্যাহার হয়ে যায়। ফলে, ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রাপ্যতা হিসাব করে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে আসলে বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতা কতটা নিশ্চিত হয়েছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়।

তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা। এই অববাহিকায় সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও জমির উৎপাদনশীলতা একসঙ্গে নির্ভর করে তিস্তার ওপর। দীর্ঘদিন ধরে পানিস্বল্পতা, অসম প্রবাহ এবং শুষ্ক মৌসুমে অনিশ্চয়তা উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে, বাংলাদেশ যদি গঙ্গা-তিস্তাসহ অন্যান্য আন্তসীমান্ত নদীর প্রবাহে ন্যায্যতা না পায়, তবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, পানীয় জল ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে। একই সঙ্গে, দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সেচঘাটতি, নদীভাঙন ও মৌসুমি বৈষম্য অব্যাহত থাকবে।

এর সঙ্গে বাড়তি উদ্বেগ হিসেবে হাজির হয়েছে ইয়ারলুন সাংপো নদীতে (ব্রহ্মপুত্রের চীনা অংশের নাম) বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা। তিব্বতের শাননান প্রিফেকচারে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে চীন, যা ব্রহ্মপুত্রের পানি চীনের পানিসংকটে থাকা উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে। এই ধরনের বাঁধ নির্মাণ এবং পানির গতিপথ পরিবর্তন ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েরই এই নদীর ওপর নির্ভরশীল ১৪ কোটি মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দক্ষিণ এশিয়ার আরেক পানি-রাজনীতির উদাহরণ সিন্ধু পানি চুক্তি। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি ছিল এক বিরল ঘটনা। কারণ, ভারত ও পাকিস্তান তিনবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়েছে, সীমান্তে অসংখ্য সংঘর্ষ হয়েছে, কাশ্মীর নিয়ে বৈরিতা কখনো থামেনি, তবু এই চুক্তি টিকে ছিল।

চুক্তি অনুসারে সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি প্রধান নদীর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের তিনটি নদী—রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর নিয়ন্ত্রণ ভারত পায়। পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি নদী, সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের অধিকাংশ পানির অধিকার পায় পাকিস্তান। এই সমঝোতায় মধ্যস্থতা করেছিল বিশ্বব্যাংক। তখনকার বিশ্বরাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়াকে স্থিতিশীল রাখা ছিল পশ্চিমা শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রয়োজন। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন চেয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান অন্তত পানির প্রশ্নে সংঘাতে না জড়াক। নদীকে তাই কূটনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হওয়ার আগেই একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে বেঁধে ফেলা হয়েছিল।

তবে এই চুক্তির ভেতরেই ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ ছিল। পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করে সিন্ধু অববাহিকার ওপর। দেশটির পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলের বিশাল কৃষিজমি এই নদীব্যবস্থার পানি ছাড়া প্রায় অচল। অন্যদিকে ভারত, বিশেষত কাশ্মীর অঞ্চলে, দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছে যে চুক্তিটি তাদের জন্য অসম ভারসাম্য তৈরি করেছে। ভারতের মতে, উৎসভূমি তাদের ভূখণ্ডে হলেও ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা এত বেশি যে তারা নিজেদের জলসম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না।

এই অসন্তোষ সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যু যখন দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তখন নদীও নিরাপত্তা রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে। ভারতের বিভিন্ন সরকার বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পানিবণ্টন চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। ২০১৬ সালে উরির হামলার পর ভারতের রাজনৈতিক মহলে একটি স্লোগান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না’ এবং অবশেষে ২০২৫ সালে কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত এই হুমকিকে বাস্তবায়ন করে দেখায়। তারা সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করে। এটা যে স্পষ্টতই একধরনের চাপ পাকিস্তানের ওপর, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু অববাহিকার পানির প্রাপ্যতার বিষয়টি অস্তিত্বগত। দেশটি মনে করে, ভারত যদি ধীরে ধীরে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইসলামাবাদ কৌশলগত চাপে পড়ে যাবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত-পাকিস্তান পানি-রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, কাশ্মীর পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির চাপ কত দ্রুত বাড়ে। এবং তৃতীয়ত, চীন কী ভূমিকা নেয়। কারণ, সিন্ধু অববাহিকার উৎস অঞ্চলগুলোর সঙ্গে চীনের তিব্বত ভূরাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। বেইজিং দক্ষিণ এশিয়ার জল-রাজনীতিতে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ভারত যেমন পাকিস্তানের ওপর পানির প্রভাব নিয়ে ভাবছে, তেমনি ভারত নিজেও চীনের উজানের অবস্থান নিয়ে সতর্ক।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং উজানের দেশ হিসেবে ভারত মূলত দুটি কেন্দ্রীয় বিষয়ে ভাবছে। একটি হলো চীন এবং অন্যটি অন্যান্য দেশে (বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে) প্রবাহিত উজানের নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ। ভারতের সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থান থাকায় ফারাক্কা ও তিস্তার পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পানিকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহারের প্রমাণিত সক্ষমতাও তাদের আছে। পাশাপাশি, এই অঞ্চলের অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের তুলনায় ভারতের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তিগত এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা সত্ত্বেও তিস্তা এবং গঙ্গা চুক্তি ভবিষ্যতেও হয়তো বিরোধের একটি বড় কারণ হয়ে থাকবে।

ইবোলা নিয়ে সতর্ক হওয়ার সময় এখনই

আন্তর্জাতিক চা দিবস: সবুজ অরণ্যে ঢাকা ধূসর জীবন

আসন্ন বাজেট কেমন দেখতে চাই

যান্ত্রিক উৎকর্ষ ও মানবিকতার ভবিষ্যৎ

সামাজিক ব্যবসার হাত থেকে স্বাস্থ্যকে বাঁচান

জাতীয় বাজেট ও কৃষকের প্রত্যাশা

মাজারে হামলা কারা করে

শিশু ধর্ষণ বন্ধ হোক

সরকারের কাজ ফুটবল মাঠের রেফারির ভূমিকার মতো: ড. রুশাদ ফরিদী

বৃষ্টির ধরন কি বদলে যাচ্ছে