হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

তেলাপোকাদের বিদ্রোহ কি ভারতে নতুন রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে

কামরুল হাসান

প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরের প্রক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছে সিজেপি। ছবি: এএফপি

ভারতের রাজনীতিতে বহু আন্দোলন এসেছে, বহু স্লোগান জন্ম নিয়েছে। কখনো দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, কখনো জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান, আবার কখনো নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভ। কিন্তু সামান্য তেলাপোকার মতো এক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর পরিচয়কে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করার ঘটনা সম্ভবত আগে কখনো দেখা যায়নি। দিল্লির যন্তর মন্তর চত্বরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তাই নিছক একটি ছাত্র আন্দোলন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা নয়; বরং এটি ভারতের তরুণসমাজের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা এবং বঞ্চনার এক নতুন ভাষা। ইতিহাস বলছে, তরুণদের ক্ষোভ যখন সংগঠিত রাজনৈতিক ভাষা পায়, তখন তা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সমীকরণও বদলে দিতে পারে।

তেলাপোকাদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল একটি মন্তব্যকে ঘিরে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি পর্যবেক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা বহু তরুণের কাছে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ক্ষমতাবানদের অবজ্ঞাসূচক শব্দ অনেক সময়ই প্রতিবাদের শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। এ ঘটনা তারই একটি বড় উদাহরণ।

এখন ভারতের তরুণেরা ‘আমিও তেলাপোকা’ স্লোগান তুলে সেই পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তবে এই আন্দোলনের শক্তি কেবল প্রতীকী প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির সংকট, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অনিশ্চয়তা, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। এসব সমস্যা ভারতের কোটি কোটি তরুণের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। যখন একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তার ক্ষোভ কেবল একটি পরীক্ষাকে ঘিরে থাকে না; সেটি পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থায় রূপ নেয়। যন্তর মন্তরের সামনে সেটাই ঘটে চলেছে।

সিজেপির উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে জন্ম নিয়েছে। কোনো পুরোনো দল, পরিচিত নেতা বা প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের হাত ধরে নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত এক প্রজন্মের মধ্য থেকে এর জন্ম। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কোটি কোটি অনুসারী অর্জন করা দেখিয়েছে যে ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য আর আগের মতো বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো থাকা অপরিহার্য নয়। একটি প্রতীক, একটি ন্যায়সংগত দাবি ও তা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা এবং একটি ক্ষোভ—এই চারের সমন্বয়ে দাবানলের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হতে পারে।

এখানে ভারতের শাসক দল এবং বিরোধী দল উভয়ের জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের জন্য বার্তা হলো, প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা জবাবদিহির ঘাটতি আর আগের মতো চাপা রাখা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের বিস্তার এখন এত দ্রুত ঘটছে যে সেটি মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মকে যদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেই ভুলের রাজনৈতিক মূল্য একসময় দিতে হতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জন্যও এই আন্দোলন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কংগ্রেসের বর্তমান নীরবতা সেই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করেছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, এই নতুন তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষা কী? তারা কি প্রচলিত বিরোধী রাজনীতির অংশ হবে, নাকি সম্পূর্ণ নতুন কোনো রাজনৈতিক ধারা তৈরি করবে? তরুণদের মনের ভাষা পড়তে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বিরোধী দলগুলো। ইতিহাস বলে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো যখন নতুন সামাজিক বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন কিন্তু নতুন শক্তির উত্থান ঘটে। জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন থেকে শুরু করে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে এমন অনেক উদাহরণ এনে দিয়েছে।

এই আন্দোলনের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। কোনো আন্দোলন জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি তাকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বা ওয়েবসাইট বন্ধের অপচেষ্টা করা হয়, তাহলে তা প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। ডিজিটাল যুগে তথ্য নিয়ন্ত্রণের পুরোনো কৌশল খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়। বরং নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় আন্দোলনকে আরও বেশি প্রচার এনে দেয়। সিজেপির ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতার আভাস দেখা যাচ্ছে।

ভারতের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—এটি কি সাময়িক ক্ষোভ, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির রূপান্তরের সূচনা? এর উত্তর হয়তো এখনই দেওয়া কঠিন। তবে কিছু লক্ষণ উপেক্ষা করা যায় না। তরুণেরা যখন নিজেদের পরিচয়ের চেয়ে বঞ্চনার অভিজ্ঞতায় বেশি একত্র হয়, যখন রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে সুযোগ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন নতুন ধরনের আন্দোলনের জন্ম হয়। এই আন্দোলন হয়তো আগামী নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে না, কিন্তু এটি ভারতের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বদলে দিতেও পারে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ২৪-এর গণ-আন্দোলন থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়ার আছে। সেই শিক্ষা হলো, তরুণদের হতাশাকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। একটি দেশ তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন তার তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিশ্রমের চেয়ে দুর্নীতি শক্তিশালী, মেধার চেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুবিধা পায়, তাহলে সেই অসন্তোষ একসময় রাজনৈতিক বিস্ফোরণে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা তার বড় উদাহরণ।

আবার বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্যও এই ঘটনা শিক্ষণীয়। আমাদের সমাজেও শিক্ষাব্যবস্থা, চাকরি, নিয়োগ পরীক্ষা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্র যদি তরুণদের উদ্বেগকে সময়মতো গুরুত্ব না দেয়, যদি তাদের কণ্ঠস্বরকে অবজ্ঞা করা হয়, তাহলে ক্ষোভ জমতে জমতে একসময় অপ্রত্যাশিত রূপ নিতে পারে। আজকের তরুণেরা শুধু ভোটার নন; তাঁরা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর একটি বৈশ্বিক প্রজন্ম, যারা মুহূর্তের মধ্যে সংগঠিত হতে পারে এবং নিজেদের বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারে।

যন্তর মন্তরের এই সমাবেশ তাই কেবল কয়েক হাজার তরুণের বিক্ষোভ নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসছে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া তরুণসমাজ। ‘তেলাপোকা’ শব্দটি হয়তো ব্যঙ্গ হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু সেটিই এখন ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের বহু আন্দোলনের মতো এখানেও দেখা যাচ্ছে যাদের তুচ্ছ মনে করা হয়, অনেক সময় তারাই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারক-বাহক হয়ে ওঠে।

ভারতের শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষেরই তাই এই বার্তা বুঝতে হবে। তরুণদের ক্ষোভকে উপহাস করে নয়, বুঝেশুনে; তাদের কণ্ঠকে দমন করে নয়, গুরুত্ব দিয়ে; এবং জবাবদিহি এড়িয়ে নয়, নিশ্চিত করেই এই সংকটের মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায় যন্তর মন্তরের এই সমাবেশ ভবিষ্যতের আরও বড় রাজনৈতিক ঝড়ের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে। তবে সিজেপির সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সেই ধরনের কোনো নতুন সূচনার ইঙ্গিত কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভারতের তরুণসমাজের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের একটি নতুন রাজনৈতিক প্রকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। কারণ, এই আন্দোলনের জন্মই হয়েছে অপমানকে প্রতীকে পরিণত করার মধ্য দিয়ে। এভাবে যখন লাখো তরুণ একই ধরনের বঞ্চনার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলে, তখন সেটিকে রাজনৈতিক প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিলে সংকট ঘনীভূত হবে।

এখন তেলাপোকাদের বিদ্রোহ ভারতে নতুন রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য আপাতত অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে

কী দেখেছি, আরও কী দেখব

স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর গুণগত ‘অর্জন’

পাহাড় কাটা ও সজলদের জীবন

তেলাপোকার উত্থান ও তারুণ্যের ক্ষোভ

টিকার ট্রায়াল ও আফ্রিকার বিপন্ন শৈশব

এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল

সহজ সমাধান তবু উপেক্ষিতই থাকবে

তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে

বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কখনোই সুদৃঢ় নয়: উম্মে ওয়ারা