হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সামাজিক ব্যবসার হাত থেকে স্বাস্থ্যকে বাঁচান

আবু তাহের খান 

হামের টিকা না দিতে পারায় অসংখ্য শিশু হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই এটি এখন সর্বজনস্বীকৃত অভিমত যে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি-আকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বহীন অমানবিক গাফিলতির কারণেই বাংলাদেশে আজ শত শত শিশুর প্রাণহানি ঘটছে। এ ব্যাপারে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন এরই মধ্যে তাঁদের এসব অপকর্মের প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি ও বক্তব্য প্রকাশ পাচ্ছে এবং তাঁদেরকে বিচারের আওতায় আনার দাবি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত দেশ প্রতিনিধি (কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ) স্ট্যানলি গুয়াভুইয়াও গণমাধ্যমকে সরাসরি জানিয়েছেন যে হামের টিকার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করলেও বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দেয়নি।

তো এই সবই এখন চাক্ষুষ ঘটনা এবং ব্যাপকভিত্তিক মানুষের মধ্যকার আলোচনা, অভিমত ও দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। তবে এত সব আলোচনা, অভিমত ও বিচার দাবির পরও দুটি বিষয় কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিতই থেকে যাচ্ছে, যার একটি হচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় টিকা কেনা কেন বন্ধ করেছিলেন? আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, শিশুহত্যার মতো এত বড় একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ করা সত্ত্বেও মুহাম্মদ ইউনূস, নূরজাহান বেগম ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার কেন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না? দুটি বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হওয়া এবং তদনুযায়ী বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

এখন উল্লিখিত প্রশ্ন দুটির জবাব খোঁজার চেষ্টা করা যাক। প্রথমেই টিকা কেনা কেন বন্ধ করা হয়েছিল, সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধানের চেষ্টা। মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রামের জোবরা গ্রাম থেকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করেছিলেন ১৯৭৬ সালে, যেটিকে পরে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। আর নিজের চমক সৃষ্টিকারী বাক্‌নৈপুণ্য ও আকর্ষণীয় প্রচার কৌশলের কারণে দেশের বাইরেও তিনি এ ব্যাংকের একটি ভালো পরিচিতি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে বাস্তবে এ ব্যাংক তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে না পারায় এবং এর নির্দয় ঋণ আদায় কৌশলের কারণে সাধারণ মানুষ অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখন তাঁকে কার্যত বৈদেশিক লবি রক্ষাকারী বাক্‌পটু সুদি মহাজন হিসেবেই চেনে। এ অবস্থায় বিচক্ষণ মুহাম্মদ ইউনূস সহজেই বুঝতে পারেন যে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবসায় তাঁর আর সুবিধা হবে না এবং এখন দরকার এমন নতুন কোনো ব্যবসায়িক ক্ষেত্র, যার আওতায় গ্রাহকের সংখ্যা ও মুনাফা দুই-ই ক্ষুদ্রঋণের চেয়েও বেশি হবে। আর তা চিন্তা করেই ২০০৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস (জিএইচসি) লিমিটেড। এর আওতায় রয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ নামের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক, চক্ষু হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ, হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ইত্যাদি অনেক কিছু।

ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহকেরা মূলত দরিদ্রশ্রেণির। কিন্তু জিএইচসির আওতাধীন সেবাগ্রহীতারা ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সব শ্রেণি থেকে আসা মানুষ। আর ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের তুলনায় জিএইচসির গ্রাহকেরা আর্থিক সামর্থ্যে যেমনি এগিয়ে, তেমনি সংখ্যায়ও অনেক বেশি। ফলে মুনাফা অর্জনের বিবেচনায় শেষোক্তরা অনেক বেশি সম্ভাবনাময় এবং সে কারণে তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসাটিও অধিক লাভজনক হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর সে বিবেচনা থেকেই ক্ষুদ্রঋণ ঘিরে গ্রামীণ ব্যাংকের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে আড়ালে রেখে অধিকতর লাভজনক ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার জন্যই সামাজিক ব্যবসার নামে গ্রামীণ হেলথ কেয়ার পরিবারের যাত্রা। আর সে যাত্রাকে অধিকতর সুযোগ ও সুবিধাজনক পরিবেশ দেওয়ার জন্যই তিনি ২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ক্ষমতা অপব্যবহার করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে টিকা কেনা থেকে বিরত রাখেন। আর তারই ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ৫০০ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে; বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে যেটিকে হত্যা হিসেবেই গণ্য করা চলে। অতএব প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে এটি এখন স্পষ্ট যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন টিকা কার্যক্রমকে বস্তুত ওই গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই ২০২৫ সালে টিকা আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিদায় নেওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে যেসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, সেসবের গতিধারা থেকেও বিষয়টির যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। ৮ মে নিজের ফেসবুক পেজে তিনি জানান, সামাজিক ব্যবসার আওতায় বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা-সংক্রান্ত ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা কোম্পানি অ্যাপেক্স হেলথের (কাতারভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে গ্রামীণ হেলথ সার্ভিস লিমিটেডের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থে এ ধরনের বহুজাতিক কোম্পানিকে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই অন্তর্বর্তী সরকারে থাকার সময় তিনি সরকারি স্বাস্থ্য খাতকে নানাভাবে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আর তারই নানা চেষ্টার একটি হচ্ছে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা আমদানি বন্ধ করে দেওয়া। শোনা যায়, গ্রামীণ হেলথ সার্ভিসেসকে টিকা আমদানির সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই তিনি ইউনিসেফকে সরিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কিনতে চেয়েছিলেন, যাতে দরপত্রে অংশ নিয়ে গ্রামীণ হেলথ সার্ভিসেস সে কাজ পেয়ে যেতে পারে।

এবার আসা যাক লেখার শুরুতে উত্থাপিত দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রসঙ্গে। টিকা কেনা বন্ধ রাখাজনিত কারণে এত বিরাটসংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না—গণমাধ্যমকর্মীদের এরূপ প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী সবাই আলাদা আলাদাভাবে হলেও এক ও অভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁরা অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে সামনের দিকে এগোতে চান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এতগুলো শিশুহত্যার কারণ সৃষ্টির মতো ঘটনার দায় চিহ্নিতকরণকে যদি এরূপ দায়িত্বশীল পর্যায়ের মানুষেরা ‘অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি’ বলে চিহ্নিত করেন, তাহলে এ রাষ্ট্রের কাছে মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? আর ঘাঁটাঘাঁটি করতে না চাওয়ায় সাধারণ মানুষকে কি তাহলে এটিই ধরে নিতে হবে যে, তারা (অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার) আসলে পারস্পরিক সমঝোতার সরকার, যার নেতারা একে অপরকে না ঘাঁটিয়ে নিজেদেরকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখতে চান?

লক্ষ করা যাচ্ছে যে নবনির্বাচিত সরকার পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা-গাফিলতি নিয়ে যেমন ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইছে না, তেমনি তারা কথা বলতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি), নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরকরণ কিংবা ঋণখেলাপিদের নামমাত্র নগদ পরিশোধের (ডাউন পেমেন্ট) বিপরীতে উপর্যুপরি ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণের সুযোগদান ইত্যাদি বিষয়েও। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, অন্তর্বর্তী সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন ও তাদেরকে প্রশ্নহীন দায়মুক্তি দেওয়ার জন্যই কি নতুন সরকারকে মানুষ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী করেছে? মানুষ কিন্তু এসব দেখে দ্রুতই হতাশ হয়ে পড়ছে। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে তাদেরকে নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস ছিল, তা কিন্তু এখন ক্রমেই ফিকে হয়ে যেতে শুরু করেছে। ভালো কিছু দেখার জন্য তিন মাস কেন, বহু মাস অপেক্ষা করতেও মানুষের আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আপত্তি তৈরি হয় তখনই, যখন দেখা যায় যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নতুন সরকারের কাজগুলো আরও বেশি করে মিলে যাচ্ছে। বিষয়টি সরকার, রাষ্ট্র ও জনগণ—কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

সরকারে থাকাকালে তো বটেই, সরকার থেকে বিদায় নেওয়ার পরও মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে যেভাবে তথাকথিত সামাজিক ব্যবসার নাম করে গ্রামীণ হেলথ সার্ভিসেসের মতো এনজিও ও বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চাইছেন, তা থেকে এ খাতকে বাঁচানোটা খুবই জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের চরম পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও স্বাস্থ্য খাত ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে। আর বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ দেশে তো এমনটি না হওয়ার কোনো কারণই নেই। বাংলাদেশের সংবিধানেও স্পষ্ট নির্দেশনা আছে যে ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন’ (অনুচ্ছেদ ১৮.১)। এমনি পরিস্থিতিতে সংবিধানের নির্দেশনা, স্বাস্থ্যের মতো একটি মৌলিক চাহিদা পূরণের গণতান্ত্রিক চেতনা এবং সর্বোপরি জীবনকে মূল্যবান গণ্য করার মানবিক মূল্যবোধের বিবেচনায় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা দেশের স্বাস্থ্য খাতকে তথাকথিত সামাজিক ব্যবসার হাত থেকে রক্ষাকল্পে দ্রুত এগিয়ে আসবেন—এটিই সর্বান্তকরণ প্রত্যাশা।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক

জাতীয় বাজেট ও কৃষকের প্রত্যাশা

মাজারে হামলা কারা করে

শিশু ধর্ষণ বন্ধ হোক

সরকারের কাজ ফুটবল মাঠের রেফারির ভূমিকার মতো: ড. রুশাদ ফরিদী

বৃষ্টির ধরন কি বদলে যাচ্ছে

মানুষ কী করে বাঁচবে

সম্ভাবনার পথ কি দেখাবে এবারের শিক্ষা বাজেট

বিশ্বজুড়ে ডানপন্থার উত্থান

চিকিৎসাব্যবস্থা কবে স্বস্তির হবে

ট্রাম্প কি আবার ইরানে সংঘাতে জড়াবেন