পঞ্চাশের দশকে রাষ্ট্রের দিক থেকে আওয়াজটা ছিল জাতি গঠনের। পাকিস্তানি নামে কোনো জাতি তো ছিল না, ওই নামে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল মাত্র। জিন্নাহ সাহেব বুদ্ধিমান মানুষ, তিনি বুঝে ফেলেছিলেন, নতুন রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখাটা সহজ কাজ হবে না। যে জন্য তিনি জোর দিয়ে বলতেন, পাকিস্তান হ্যাজ কাম টু স্টে। আওয়াজের ওই জোরটাই বলে দিত, ভেতরে অন্তর্বস্তুর ঘাটতি রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে, কিন্তু দেশভাগের পর দ্বিজাতিতত্ত্ব তো আর কার্যকর শক্তি নয়। রাষ্ট্রকে সুগঠিত করার জন্য এবং টিকিয়ে রাখতে নতুন একটি জাতি দরকার। সেই জাতি পাঞ্জাবি, বাঙালি, সিন্ধি, পাঠান বা বেলুচ বলে কুলাবে না, হওয়া চাই পাকিস্তানি। এই যে বিভিন্ন জাতি, যাদের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন, তাদেরকে ধর্মের সাহায্যে এক করা যাবে না; কারণ, সকলের ধর্ম এক নয়, অধিকাংশের ধর্মই ইসলাম বটে, তবে ধর্মীয় আচরণের ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য, ধর্মাচরণে তিনি নিজেও যে খাঁটি নন, এটা তো তাঁর অজানা ছিল না।
‘পাকিস্তান’ অর্জনের জন্য সম্প্রদায়কে জাতিতে পরিণত করা হয়েছিল, ওই খোঁজে তিনি ছিলেন; কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ওই সাম্প্রদায়িকতার ওপর যে ভরসা করা যাবে না, সেটি তিনি টের পেয়ে গিয়েছিলেন; তা ছাড়া যাদেরকে তিনি ভারতে ফেলে রেখে নিজের জন্মশহর করাচিতে চলে এসেছেন, ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে তারা যদি নিজেদের পাকিস্তানি বলে দাবি করে, তাহলে তারা যে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত, সেটাও তো অস্পষ্ট ছিল না। ওদিকে জাতি গঠনে ধর্ম নয়, ভাষাই যে প্রধান উপাদান, সেটাও তাঁর মতো একজন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের পক্ষে অজানা থাকার কথা নয়।
এসব বিবেচনা করেই হয়তো তাঁর ধারণা হয়েছিল, পাকিস্তানি নামে নতুন যে জাতিটি তৈরি করা দরকার, সেটি ধর্মভিত্তিক না হয়ে হবে ভাষাভিত্তিক। এবং সে ভাষা অবশ্যই হবে উর্দু, কেননা সেটিই মুসলমানদের নিজস্ব ভাষা; নিজে তিনি উর্দুভাষী ছিলেন না, তাঁর মাতৃভাষা ছিল গুজরাটি এবং নবগঠিত রাষ্ট্রটির ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা যে উর্দু নয়, এসব সত্যকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু উর্দু যে বাঙালিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, সেটা তো তাঁর জানা হয়ে গিয়েছিল পূর্ববঙ্গে প্রথম এবং একমাত্র সফরে এসেই। এরপরে ওই বিষয়ে তিনি আর উচ্চবাচ্য করেননি; অবশ্য বিরূপ অভিজ্ঞতাটি লাভের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর আগে জিন্নাহ সাহেব নিশ্চয় এটা বিলক্ষণ বুঝে ফেলেছিলেন, পাকিস্তানে শাসন প্রতিষ্ঠা হবে আমলাদেরই। সামরিক আমলারা হয়তো তাঁর ধারণার মধ্যে আসেনি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান এবং তাঁর সহকর্মীরা যে আমলাতান্ত্রিক হয়ে উঠছেন, সেটা তাঁর অভিজ্ঞতার ভেতরই এসে গিয়েছিল, অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকার সময় তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে নব্য শাসকদের মনোযোগের অভাব লক্ষ করে।
জিন্নাহর শঙ্কা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়নি। রাজনীতিকেরাই যে শুধু আমলাতান্ত্রিক হয়ে উঠেছেন তা নয়, আমলাতন্ত্র নিজেই শক্তিশালী হয়ে উঠল এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করল। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নিহত হলেন এবং অনুমান করার সংগত কারণ থাকল যে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংযোগ ছিল। গভর্নর জেনারেল, আমলা-শিরোমণি গোলাম মোহাম্মদ ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিন নিয়োগ পেলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা চলে গেল সামরিক বাহিনীর হাতেই। কৈশোরে আমরা এসব ঘটনা দেখছিলাম।
ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার এবং জাতি গঠনের ব্যাপারে চেষ্টা অব্যাহত ছিল। সরকারি প্রচার ওইভাবেই চলছিল। পাকিস্তানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের তৎপরতাও দেখা গেল। ধরা যাক আমাদের পাড়ার মুকুল ফৌজের কথাটাই। মুকুল ফৌজ গঠিত হয়েছিল আজাদ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এবং পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে কিশোরদের যুক্ত করার অভিপ্রায়ে। আমাদের পাড়ার মুকুল ফৌজের কুচকাওয়াজে ফররুখ আহমদের লেখা একটি গান গাওয়া হতো, যেটির প্রথম দুই পঙ্ক্তি ছিল, ‘মাটির পুতুল নইতো আমরা আজাদ পাকিস্তানি/ কেমন করিয়া রাখিব আজাদী জানি, তাহা জানি।’
অমীমাংসিত কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ যুদ্ধের রূপ নেবে—এমন আশঙ্কায় ‘মাটির পুতুল’কে সবল করার লক্ষ্যে রাইফেল ছোড়ার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার সঙ্গে আমাদের ছাত্র সংঘও যুক্ত হয়ে পড়ে। ঘটনাটা ছিল এই রকমের। আজিমপুর-পলাশীর রাস্তার সংযোগের চৌমাথায় পলাশী ব্যারাকের এক কোণে সেনাবাহিনীর এক পাঠান অফিসার বসবাস করতেন। বয়স্ক মানুষ। সম্ভবত সেনাবাহিনীতে রিক্রুটিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। একাকীই থাকতেন, তবে ছিলেন মিশুক প্রকৃতির। তিনিই আমাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে রাইফেল ছোড়ার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। এবং সেটা তিনি করেছিলেনও। পাশেই তো সীমান্ত রক্ষীবাহিনী ইপিআরের হেডকোয়ার্টার্স, ট্রেনিংয়ের জন্য তাদের কাছ থেকে রাইফেল ব্যবহারের ব্যবস্থা ওই অফিসারটিই করে দিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়েই আমাদের ট্রেনিং। একটা চাঁদমারিও তৈরি করা হয়েছিল টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্য। তবে প্রশিক্ষণ ছিল খুবই স্বল্পকালীন; বিকেলবেলার আয়োজন, সপ্তাহ দুয়েক চলেছিল কি না সন্দেহ। অন্যদের সঙ্গে আমিও কয়েক দিন অংশ নিয়েছি। তবে উৎসাহ পাইনি। আসল কথা, আমাদের দিক থেকে অভাব ছিল আগ্রহের।
ওদিকে রাষ্ট্রভাষার জন্য আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। রাষ্ট্রকে রক্ষা করার চেষ্টায় নিজেদেরকে সৈনিক হিসেবে দেখার উৎসাহে তাই ভাটা পড়ে গিয়েছিল। শতকরা ৫৬ জন নাগরিকের বসবাস যে অঞ্চলে, সেটি তো ছিল একেবারেই বিচ্ছিন্ন। ওদিকে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন যে মোহাজেররা, তাঁরা মূলত ছিলেন উর্দুভাষী; পূর্ববঙ্গে তাঁরা মোটেই সাদরে গৃহীত হননি, পশ্চিম পাকিস্তানেও যে তাঁরা সমাদর পেয়েছেন এমনটাও নয়। বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষায় ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষকে একসঙ্গে করে উত্তর আমেরিকায় যে চেষ্টা হয়েছিল নতুন একটি জাতি সৃষ্টির এবং মনে হয়েছিল, সফলতাও পাওয়া গিয়েছিল, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং ইংরেজিকে কিন্তু রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে গ্রহণ সত্ত্বেও তার ভেতরও কিন্তু অনৈক্য দূর হয়নি। ঐক্যের অভাব এখন বেশ প্রত্যক্ষই হয়ে উঠেছে এবং স্বীকার করা হচ্ছে, দক্ষিণ আমেরিকা তো বটেই, উত্তর আমেরিকাও বহু-সংস্কৃতির একটি মহাদেশ। সংস্কৃতির ভিন্নতা কিন্তু জাতিগত ভিন্নতা থেকে খুব বেশি দূরের বাস্তবতা নয়।
পাকিস্তানে নতুন জাতি গঠনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই। এটি একটি নির্মম বক্রাঘাত বৈকি। রাষ্ট্র নিজেকে যতই শক্তিশালী করার চেষ্টায় অস্থির হয়েছে, জাতি গঠনের কাজ ততই কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এই ব্যাপারটা ঘটানোর কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্য কেউ নয়, জাতির পিতা বলে সম্বোধিত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বয়ং। ১৯৪০ সালে ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য যে স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবি তুলে ধরা হয়েছিল, তাতে দুই অংশে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের কথাই ভাবা হয়েছিল, অখণ্ড কোনো রাষ্ট্রের কথা বলা হয়নি। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা যখন দেখা দিল, জিন্নাহ নিজেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন দুই পাকিস্তানকে এক করার।
নতুন রাষ্ট্রের কাঠামো ফেডারেল রইল না, হয়ে পড়ল এককেন্দ্রিক এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতা যেহেতু অবাঙালি (মূলত পাঞ্জাবি) সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের করতলগত হয়ে গেল, পূর্ববঙ্গ তাই না দেখে পারল না যে সে অখণ্ড বঙ্গ থেকে শুধু বিচ্ছিন্নই হয়নি, এমন একটি শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে যেটি এবং স্বৈরাচারী ঔপনিবেশিক। পূর্ববঙ্গে তাই জাতি গঠনের কাজ এগোল না, এগিয়ে গেল শ্রেণিগঠনই। মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশই প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়াল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবৈজ্ঞানিক ও নিষ্ঠুর বক্রাঘাতিক চরিত্রের প্রকাশ নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ধরা যাক মুনীর চৌধুরীকেন্দ্রিক ঘটনাটা। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি কারাবন্দী হন এবং বন্দী অবস্থায় থাকতে হয় প্রায় আড়াই বছর। অভিযোগ, তিনি যে শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল ছিলেন, তা-ই নয়, নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টিরও সদস্য ছিলেন। আর ঠিক ওই সময়েই তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের একজন কাইয়ুম চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ শেষে শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট হিসেবে সোর্ড অব অনার লাভের সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন। সেখানেই শেষ নয়, একাত্তর সালে মুনীর চৌধুরী যখন হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর তল্পিবাহক আলবদরদের হাতে শহীদ হচ্ছেন, কাইয়ুম চৌধুরী তখন ওই সেনাবাহিনীতেই একজন ব্রিগেডিয়ার। এবং উভয়ের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, বাংলা একাডেমির পরিচালক কবীর চৌধুরী প্রাণভয়ে কাতর এবং তাঁদের আরেক ভ্রাতা, যিনি ছিলেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক, তিনি কারাবন্দী।
মোটকথা, পাকিস্তান যে না-ও টিকতে পারে, সেই চিন্তা জিন্নাহ সাহেবের নিজেরও ছিল, যে জন্য অবশ্যই টিকবে—কথাটা তিনি জোর দিয়েই বলতেন, তবে তাঁর কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। সেটা মূলত স্বাস্থ্যগত কারণে ঘটলেও মানসিক যন্ত্রণা যে ছিল, সেটা বুঝতে অসুবিধা নেই। অন্যান্য ঘটনা তো ছিলই, এ ছাড়া তিনি বিশেষভাবে পীড়িত হয়েছিলেন তাঁর জন্মশহর করাচির নাগরিকদের দেশত্যাগের অমানবিক দৃশ্য দেখে। তখন তিনি অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। তবে অশ্রুপাত ছিল তাঁর জীবনে বিরল ঘটনা।