হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ট্রাম্প যা করছেন, তা ‘পাগলামি’ নয়

রাজিউল হাসান

ট্রাম্পের কাজ যতটাই পাগলামি মনে করা হোক, সেগুলো আসলে একজন ব্যবসায়ীর পদক্ষেপ। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় বসেছেন সবে এক বছর হলো। এর মধ্যেই তাঁর নানা কর্মকাণ্ডে পুরো বিশ্ব অস্থির হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিন তিনি সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন একাধিক ইস্যুতে। আজ তিনি ভেনেজুয়েলায় অভিযানের নির্দেশ দিচ্ছেন, তো কাল হুমকি দিচ্ছেন ইরানকে। আবার পরশু তাঁর নজর হয়ত চীনের দিকে। সেদিনই অথবা তার পরদিন দেখা যাবে হুমকি দিচ্ছেন প্রতিবেশী দেশগুলোকে, নতুবা ইউরোপকে।

আপাতদৃষ্টে যে কারও মনে হতে পারে, ট্রাম্প হয়তো পাগলামি করছেন। তাঁর পাগলাটে আচরণে অস্থির হয়ে উঠছে বিশ্ব। কিন্তু একটু গভীরে ভাবলে বোঝা যায়, ট্রাম্প আসলে কোনো পাগলামিই করছেন না; বরং তিনি যা করছেন, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচন কিংবা ২০২৪ সালের নির্বাচন—উভয় নির্বাচনে ট্রাম্পের স্লোগান ছিল—মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন। অর্থাৎ আমেরিকাকে আবার মহান করো। তিনি ২০১৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ক্ষমতায় এসে যা কিছু করেছেন, এবার দ্বিতীয় দফায় এসে সেগুলোরই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি তিনি প্রথম মেয়াদে যে কাজগুলো সম্পন্ন করে যেতে পারেননি, এবার ক্ষমতায় বসেই তিনি সেই কাজগুলো শেষ করার নানা উদ্যোগ নিয়েছেন।

এবার ট্রাম্পের এক বছর পূর্তিতে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে কতটা টালমাটাল করেছেন, তার একটা পর্যালোচনা করা যাক। তিনি ক্ষমতায় বসার পর গত এক বছরে মার্কিন বাহিনী সাতটি দেশে বোমা ফেলেছে। এগুলো হলো ভেনেজুয়েলা, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়া। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলায় যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তার মাধ্যমে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত এক বছরে তিনি আটটি যুদ্ধ ঠেকিয়ে দিয়েছেন। এগুলো হলো ইসরায়েল-হামাস সংঘাত, ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ, পাকিস্তান-ভারত সংঘাত, রুয়ান্ডা-গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো সংঘাত, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সংঘাত, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সংঘাত, মিসর-ইথিওপিয়া সংঘাত ও সার্বিয়া-কসভো সংঘাত।

এ ছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প বিভিন্ন তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর একান্ত উদ্যোগের কারণেই গত আগস্টে আলাস্কায় সফরে এসেছিলেন পুতিন, বৈঠক করেছেন তাঁর সঙ্গে। যুদ্ধ বন্ধে মিষ্টি কথায় যখন কাজ হয়নি, তখন হুঁশিয়ারি দিতেও থামেননি ট্রাম্প। এমনকি যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমিয়ে আনতে তিনি দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করে, ভারতসহ এমন কিছু দেশের ওপর সম্প্রতি শুল্ক চাপিয়েছেন। অবশ্য তাতে এখনো কিছু হয়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তাঁর প্রশাসন।

এসবের বাইরে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ইরানসহ মুসলিমপ্রধান কয়েকটি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে শত্রু-মিত্র সবার ওপর চাপিয়েছেন বাড়তি শুল্ক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে গেছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থায় তহবিল বন্ধ করেছেন।

বন্ধ করেছেন ইউএসএইডের তহবিল। বেরিয়ে গেছেন জলবায়ু চুক্তি থেকে। নিজ দেশের সীমান্তে আবার বেড়া দেওয়া শুরু করেছেন।

বিশ্বের পরাক্রমশালী একটি দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে ট্রাম্প এক বছরে যা কিছু করেছেন, সেগুলো অনেক রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সরকারপ্রধানের পক্ষে এই সময়ের মধ্যে করা কঠিন। এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প এক বছরেই এত কিছু কেন করে ফেললেন? প্রথমে এই এক বছরের খতিয়ান পর্যালোচনা করলে মনে হবে, পুরো বিশ্বকে এলোমেলো করে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, ট্রাম্প আসলে ব্যবসায়িক স্বার্থ ছাড়া কিছুই দেখছেন না। এ ক্ষেত্রে শুধু নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ নয়, মোটের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ করছেন তিনি। কারণ, তিনি পাকা ব্যবসায়ী। এ ছাড়া শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের প্রতি তাঁর দুর্বলতা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি এই পুরস্কার পেতে চান এবং এর জন্য নিজেকে যোগ্যও মনে করেন।

এবার একে একে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে তার মোড়লগিরি ধরে রাখতে বহু বছর ধরে শুল্ক প্রশ্নে ব্যবসায়িক অংশীদারদের ছাড় দিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার যেহেতু বড় এবং তাদের অর্থনীতিও যেহেতু বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী, কাজেই সব দেশই চায়, তার রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসুক যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। এমনকি এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে। এই ব্যবসায়িক অংশীদারেরাই আবার নিজ দেশের উৎপাদকদের স্বার্থে মার্কিন পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বহু আগে থেকে বলে আসছেন, তিনি নিজের নাগরিকদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেন বেশি। কাজেই নিজ দেশের শিল্প ও কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অন্য দেশের ভান্ডারে তিনি ডলার জোগাতে রাজি নন। এ কারণে তিনি ব্যবসায়িক অংশীদারদের বলেছেন, তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো কোনো ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে নয়, প্রত্যেক ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে এককভাবে বাণিজ্য চুক্তি করবেন। আর সে ক্ষেত্রে চুক্তিটা হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ন্যায্য। শর্ত না মানলে বাড়তি শুল্ক গুনতে হবে বিপরীত পক্ষকে।

জাতিসংঘ, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থায়ও যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বড় ধরনের তহবিল জোগানদাতা ছিল। ট্রাম্পের দাবি, এসব তহবিল তাঁর দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছে। আর তার সুবিধা ভোগ করছে অন্য রাষ্ট্রগুলো। কাজেই তিনি এসব ছেঁটে ফেলছেন। তাতে গোটা দুনিয়ার কী হলো, সেসব নিয়ে ট্রাম্পের সেই অর্থে কোনো মাথাব্যথা নেই। এ কারণে প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডাকেও চটাতে তিনি কার্পণ্য করেননি। পিছু হটেননি ইউরোপীয় পরীক্ষিত মিত্রদের হতাশ করতেও।

তাহলে সাত দেশে বোমা ফেলার কারণ কী? ভালোভাবে সেটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যে সাত দেশে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মার্কিন স্বার্থ জড়িত ছিল। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় কেন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা এখন পরিষ্কার। ইরান, ইয়েমেন নিয়েও একই যুক্তি খাটে। তার সঙ্গে আরেকটি বিষয় হলো, ইরানকে আঞ্চলিক শত্রু মনে করে ইসরায়েল। সৌদি আরবও ইরানকে শত্রুর নজরে দেখে। অপর দিকে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী উৎপাত করছে।

কিছুদিন আগে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন ট্রাম্প। তাতে ট্রাম্প বলেছেন, এক বছরে অন্তত আটটি যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছেন তিনি। এরপরও তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। কাজেই বৈশ্বিক শান্তি নিয়ে এখন আর তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই।

এটুকুতেই পরিষ্কার, ট্রাম্প কতটা মনেপ্রাণে নোবেল প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে বসে থেকেও তিনি নোবেল কমিটির মন গলাতে পারেননি। তাঁর জন্য এর চেয়ে হতাশার আর কী হতে পারে?

সবশেষে এটুকু বলা যায়, ট্রাম্পের কাজকর্ম যতটাই পাগলামি মনে হোক, সেগুলো আসলে একজন ব্যবসায়ীর পদক্ষেপ। কাজেই সে কারণে ব্যবসা খোঁজাটাই যৌক্তিক হবে বেশি।

কর্মহীন শ্রমিক

ডেভিড ব্রুকস ও স্বৈরশাসন নিয়ে কিছু কথা

জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ কম

রাষ্ট্র তুমি কার

চীন কেন সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী

পিডিবিকে বাঁচাতে হবে

দীর্ঘ প্রণয়ের পর বিচ্ছেদের পথে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশে বইমেলার অর্থনীতি

সৌরবিপ্লবের বিচ্যুতি একটি পরিকল্পিত বাধা

কানে ধরা