গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সরকারের গণভোট প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, ‘এ সরকার রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আপনি এটাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মনে করেন? যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সংবিধানের চার দেয়ালের মাধ্যমে নয়, বাংলাদেশের রাজপথে ১৪০০ মানুষের রক্তের মাধ্যমে এ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটা মনে রাখুন। নৈতিক জোর হচ্ছে মানুষের আত্মদান।’
আজ শনিবার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশে ঢাকা বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
সরকারের মূল অ্যাজেন্ডা সংস্কার উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে একটি জাতীয় অ্যাজেন্ডা তৈরি হলো। তার চেয়েও বেশি নৈতিক ভিত্তি কিসে থাকতে পারে? কেউ যদি ভাবে এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার কাজ হচ্ছে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করে বাড়ি চলে যাবে, তাহলে বিশ্বাসঘাতকতা হবে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে। জুলাই জাতীয় সনদ কাউকে ক্ষমতায় বসানোর অ্যাজেন্ডা নয়, কাউকে ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখার অ্যাজেন্ডা নয়। সব মানুষের সম্মতি নেওয়ার জন্য গণভোট হচ্ছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি কর্মচারীদের প্রচারের বিষয়ে সংবিধান ও আইন বিজ্ঞদের পরামর্শ সরকার নিয়েছে বলে জানান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সাবেক বিচারপতি, সাংবিধানিক মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞ আইনজীবী ও আইন বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মতামতের বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ওনারা (বিশেষজ্ঞ) আলাপ-আলোচনা করে জানিয়েছেন সংবিধানে কোনো ধরনের (সরকারি কর্মচারীদের প্রচারে) বাধাবিঘ্ন নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে (আরপিও) বাধা নেই। অন্যদিকে সরকারের জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশে-২০২৫ ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য প্রচারে বাধা রাখা হয়নি। গণভোট-সংক্রান্ত অধ্যাদেশেও নিষেধাজ্ঞা নেই।
আলী রীয়াজ বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসক পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। দেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলা হয়েছে। সেটা বাংলাদেশের রাজপথে প্রদর্শিত হয়েছে। যার ভিত্তিতে এ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংবিধানের কোথাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নেই। এ সরকার প্রথম দিন থেকে বলছে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে প্রথমে সংস্কার, তারপরে মানবতা অপরাধের বিচার এবং সর্বশেষ নির্বাচন।
সরকার সংস্কার চাপিয়ে দিচ্ছে না দাবি করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। সরকার সংস্কারের কিছুই বাস্তবায়ন করছেন না। কিন্তু গণভোটে যা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর পরের ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মানুষকে বোঝাতে সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশনা দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘যারা গণভোটকে পরাজিত করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয়ভাবে নিজস্ব উদ্যোগে কথাবার্তা বলে বোঝাতে চেষ্টা করতে হবে। যারা ভুল বলছে, তারা বুঝতে পারছে না। আমি বিশ্বাস করতে চাই, তাদের অসৎ উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে। ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশগুলোর সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। সরকার আন্তর্জাতিক পথ-পদ্ধতির বাইরে কিছু করছে না।’
কর্মচারীদের উদ্দেশে আলী রীয়াজ বলেন, ‘মানুষকে জিজ্ঞেস করুন, রক্তে লেখা সনদ যে পথরেখা দেখাচ্ছে—আমি তার সঙ্গে আছি নাকি নেই। এটাই হচ্ছে হ্যাঁ ও না-এর বিষয়। আমরা সবাইকে বলি, আছি। কারণ, দেশের চাবি আপনাদের হাতে। সবাইকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের সুযোগ সকলের। আপনাদের কাজ হচ্ছে সকলের কাছে পৌঁছানো।’
গণভোটের ফলাফল নির্ধারণে ভোটের কোনো ন্যূনতম সীমা নেই বলে জানান আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের নির্বাচনে কোনো ন্যূনতম সীমা নেই।’