আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
আজ ভোটের দিনে কেন্দ্র দখল ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর কোনো চেষ্টা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য পথে পথে থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাহারা। অনিয়ম ঠেকাতে প্রায় সব ভোটকেন্দ্রে বসানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি)। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে ‘বডি-ওর্ন’ ক্যামেরাও। আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় সারা দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সাড়ে ৯ লাখের কিছু বেশি সদস্য মাঠে রয়েছেন।
গতকাল বুধবার বিকেল নাগাদ কঠোর নিরাপত্তায় সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেয় নির্বাচন কমিশন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টারে করে সরঞ্জাম পাঠানো হয়। সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি গতকাল বিকেলে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অনভিপ্রেত ঘটনা মোকাবিলায় নির্বাচন কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সারা দেশে ২৯৯টি আসনের ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
ভোট প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে এবার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ১ লাখ ৩ হাজারের মতো। এ ছাড়া পুলিশের প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার, আনসারের ৫ লাখ ৬৭ হাজার, বিজিবির ৩৭ হাজারের বেশি এবং কোস্ট গার্ডের সাড়ে ৩ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশৃঙ্খলার চেষ্টা হলেই ভোট স্থগিত
সারা দেশে এবার মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৯৫৮টি। পুলিশ বলেছে, ৮ হাজার ৭৭০ কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্র মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) নেতৃত্বে তিনজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে তিনজন পুলিশ সদস্য থাকবেন। প্রতিটি কেন্দ্রে ১৩ জন করে আনসার সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার (ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা) ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকছে। বিধি সংশোধন করে সেনাসদস্যদের প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণ পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫১ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তাঁরাও মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রথমবারের মতো এবার ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে।
কোনো কেন্দ্রে কেউ কারচুপি ও বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলেও সেই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন জানিয়েছে, উচ্চ ও মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কেন্দ্র বডি-ওর্ন ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। বেশির ভাগ বডি-ওর্ন ক্যামেরার সাহায্যে ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি কেন্দ্রীয়ভাবে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে পুলিশ। কোথাও কোনো সহিংসতা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। সব পক্ষকে নিয়ে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্র, রাস্তাঘাট, যানবাহন যে যেখানেই থাকবে, তিনি নজরদারিতে থাকবেন।’
ভোটের সরঞ্জাম পৌঁছানোর পর কেন্দ্র এলাকার পুরো নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ার মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় (ব্রাঞ্চ-৩) কেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, ৫-৬ জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। রয়েছেন ১৩ আনসার সদস্য। কেউ কালো কাপড় দিয়ে গোপন কক্ষ তৈরি করছেন, কেউ বেঞ্চ ঠিক করছেন, কেউবা মিলিয়ে নিচ্ছেন ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপারের সংখ্যা।
গতকাল সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহন তল্লাশি করেন সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনে সহিংসতা করতে পারে, এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন কন্ট্রোল রুম এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর থানা পরিদর্শন করেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ সময় বলেন, ‘কন্ট্রোল রুম থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হবে। ভোট-সংশ্লিষ্ট সবকিছু নজরদারি করা হবে।’ উপদেষ্টা সাধারণ মানুষকে নিশ্চিন্তে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।