বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সারা দেশে চালানো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই বিচার শুরু হয়।
সে সঙ্গে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে। শুনানির সময় তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। আর গত ১২ জানুয়ারি তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। সালমান এফ রহমান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং আনিসুল হক তাঁর সময়ের আইনমন্ত্রী।
আজ সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, সালমান এফ রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। আর আনিসুল হক আইন রক্ষার শপথ নিয়েও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আইনি ও নীতিগত প্রশ্রয় দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলন কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ ১৬ বছরের পরিকল্পিত দমন-পীড়ন, স্বৈরতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ, একটি ঐতিহাসিক গণজাগরণ। আসামিদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হবে, তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করবে যে– এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত। এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক ক্যাডার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের ফল।
তাজুল ইসলাম বলেন, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দুই আসামিসহ সরকারের শীর্ষ মহল ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের নীলনকশা প্রণয়ন করে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের, সরাসরি গুলি চালানোর, শুট অ্যাট সাইট নির্দেশনার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণের এবং গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই এই দুই আসামি আন্দোলন দমনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেওয়ার। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণভবনে বৈঠক হয় এবং সেনা মোতায়েন ও দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়; যা হত্যাযজ্ঞকে আরও ত্বরান্বিত করে। এই হত্যাযজ্ঞের অংশ হিসেবে ঢাকার মিরপুরে সিফাত হাওলাদার, আখতারুজ্জামান, শাহরিয়ার আলভীসহ একের পর এক তরুণ প্রাণ ঝরে পড়ে। শুধু ২০ জুলাই এক দিনেই কমপক্ষে ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
নির্বাচিত সরকার এলেও বিচার চলমান থাকবে
এদিকে ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন বা নির্বাচিত সরকার এলেও বিচার চলমান থাকবে। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার আসার সঙ্গে এ বিচারের কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচিত সরকার এলেও এই বিচার চলমান থাকবে– এটা জাতির প্রত্যাশা, এটা জাতির প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। এই মাটিতে যে অপরাধ হয়েছে, যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, যে মানুষগুলো তাঁদের স্বজন হারিয়েছেন, যাঁরা গুম হয়েছেন, যাঁরা কখনো ফিরে আসেননি, তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সেই ন্যায়বিচার কনটিনিউ করবে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আর কোনো দিন এই জাতীয় অপরাধের শিকারভূমিতে পরিণত হবে না। বাংলাদেশ একটা নিরাপদ রাষ্ট্র হবে। এই বিচারের প্রক্রিয়া শেষ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি বেটার বাংলাদেশে পরিণত হবে, সেই আশাবাদ আমরা ব্যক্ত করছি।’