চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান আন্দোলনকারীদের হাঁটুর নিচে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আজ রোববার দেওয়া জবানবন্দিতে এ তথ্য জানিয়েছেন পুলিশ কনস্টেবল নাহিদ মিয়া।
নাহিদ মিয়া আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১২তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তিনি বেতার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই দিন বিকেলে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়ারলেসে নির্দেশ দেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের জন্য নিলিং পজিশনে (হাঁটুর নিচে) সিসা বুলেট ও চায়না রাইফেলের গুলি ফায়ার করবে।’ পরবর্তীতে কমিশনারের কার্যালয় ও সেন্ট্রাল প্রোগ্রাম অনুযায়ী ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার, ডিসি, এডিসি, এসি, ইন্সপেক্টর এবং ওসির (যাত্রাবাড়ী থানা) নির্দেশনায় ডিভিশন থেকে আগত ফোর্স ও অফিসার বিভিন্ন জায়গায় চায়না রাইফেলের গুলি চালান।
নাহিদ মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় এসি (ডেমরা জোন) নাহিদ ফেরদৌস ওয়ারলেস বেতারে সিসা বুলেটের গুলি চান। তিনি তাৎক্ষণিক ওসি (যাত্রাবাড়ী) আবুল হাসানকে জানান। লোক না থাকায় ওসি তাঁকে গুলি নিয়ে যেতে বলেন। তিনি নিরুপায় হয়ে ২০০টি সিসা গুলি এসি (ডেমরা জোন) নাহিদ ফেরদৌসের কাছে পৌঁছে দেন। পরদিন লোক না থাকায় তিনি বেতার অপারেটর হিসেবে ডিউটি করেন। ডিউটি চলাকালীন যাত্রাবাড়ী মাছ বাজার সংলগ্ন আউট গোয়িং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার (এসি ট্রাফিক ডেমরা) ওয়ারলেস মারফত চায়না রাইফেলের গুলি চান এবং যাত্রাবাড়ী মাছ বাজার সংলগ্ন ইনকামিং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির চায়না রাইফেলের গুলি চান। বিষয়টি তাৎক্ষণিক ওসি (যাত্রাবাড়ী) আবুল হাসানকে জানালে তাঁকে গুলি নিয়ে যেতে বলেন। নাহিদ বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও ওসি আবুল হাসান তাঁকে গুলি নিয়ে যেতে বলেন। গুলি নিয়ে যেতে দেরি হলে ওয়ারলেস মারফত পার্টি কমান্ডারেরা অশোভন কথাবার্তা বলছিলেন।
জবানবন্দিতে নাহিদ আরও বলেন, ওসি (যাত্রাবাড়ী) তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্রাগারে বলে দেন, তাঁকে গুলি নিয়ে যেতে বলেন। তিনি নিরুপায় হয়ে অস্ত্রাগার থেকে ৪০০টি চায়না রাইফেলের গুলি নিয়ে যান। যার মধ্যে ৩০০টি চায়না রাইফেলের গুলি যাত্রাবাড়ী মাছ বাজার সংলগ্ন আউট গোয়িং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডারকে (এসি ট্রাফিক ডেমরা) এবং যাত্রাবাড়ী মাছ বাজার সংলগ্ন ইনকামিং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকিরকে ১০০টি গুলি দেন তিনি। আন্দোলনের সময় তিনি বিভিন্ন মেসেজে শুনতে পান যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির কাজলা এলাকায় গুলি করে একজনকে মেরে ফেলেছেন। ৮/১০ দিন পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাকিরের গুলি করার দৃশ্য দেখতে পান। আর যে ছেলেটিকে গুলি করেছেন, তার নাম তায়িম ভূইয়া।
এ মামলার আসামি ১১ জন। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী। পলাতক আসামিরা হলেন-ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।