ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে মধ্য়প্রাচ্য়ে ভ্রমণ করা থেকে প্রায় বিরত রয়েছে পর্যটকেরা। ড্রোন হামলা, আকাশপথের অস্থিরতা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে পর্যটকদের জন্য ইরান, ইসরায়েল, ইয়েমেন, সিরিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভ্রমণ এখন বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ওই সব অঞ্চল ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় এশীয় পর্যটকেরা খুঁজে নিচ্ছে বিকল্প গন্তব্য। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক পর্যটনের অবস্থাও সুবিধার নয়, এর ফলে ভ্রমণকারীদের ক্রমবর্ধমান বিমানভাড়া এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের মধ্য দিয়েই যেতে হচ্ছে। এর বড় ধাক্কা লেগেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি ও পর্যটনের ওপর। তাদের ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ৯৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরির স্বপ্ন অনেকখানিই পিছিয়ে গেছে। কারণ, সংঘাতের সময় দেশটি বিমানবন্দরগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ভিয়েতনামভিত্তিক এলারটন অ্যান্ড কো. পাবলিক রিলেশনসের রিজিওনাল অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার মিশেল বুই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি প্রাথমিকভাবে মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে এবং সেখানকার মরুভূমি দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ফ্লাইটের টিকিট খোঁজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর পরিকল্পনা বাতিল করতে হয় মূলত দামের কারণে। সে সময় টিকিটের দাম এতটাই বেশি ছিল, তিনি এই খরচ বহন করাকে যৌক্তিক মনে করতে পারেননি। ইরান যুদ্ধের ফলস্বরূপ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিমানভাড়াও বেড়েছে। বুই দেখতে পান, মার্চ মাসে ভিয়েতনাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রাবিরতিসহ ফ্লাইটের টিকিটের দাম প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলারে পৌঁছেছিল।
সেফ হারবারস ট্রাভেল গ্রুপের প্রেসিডেন্ট জে এলেনবি একটি ই-মেইলে জানিয়েছেন, অনেক ভ্রমণকারী ফেরত-অযোগ্য তবে পরিবর্তিত নতুন ফিকে ভ্রমণ বাতিলের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ট্রাভেল এজেন্সিটির এশীয় গ্রাহকদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রুটে ভ্রমণ বাতিলের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং অনেকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৪৫০ ডলারের ফেরত-অযোগ্য ভাড়া পরিবর্তনের ফিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এলেনবি আরও বলেন, এর পরিবর্তে এই ভ্রমণকারীরা সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রস্থল বা আন্তএশীয় রুটের দিকে ঝুঁকছে।
সিঙ্গাপুর ক্রুজ সেন্টারের সিইও জ্যাকুলিন ট্যান জানান, ফেরিযোগে সিঙ্গাপুর থেকে ইন্দোনেশিয়ার বাতামে ভ্রমণকারী যাত্রীদের মধ্যে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। ট্যান আরও বলেন, সিঙ্গাপুরের কিছু ব্যবসায়ী বাতামে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, আবার অন্যরা মিটিং বা করপোরেট রিট্রিটের জন্য কর্মীদের এই দ্বীপে পাঠায়।
৬ সিঙ্গাপুরি ডলার বা ৪ দশমিক ৬৬ মার্কিন ডলারের সমান জ্বালানি সারচার্জ
থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর ও বাতামের মধ্যে ৬০ মিনিটের যাত্রাপথে জনপ্রিয় হরাইজন ফেরির গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে বলে জানান তিনি।
ট্যান বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলো বাতামে করপোরেট রিট্রিট আয়োজন করে অথবা সপ্তাহান্তে যারা স্বল্প খরচে ভ্রমণ পরিকল্পনা করছে, তারা সিঙ্গাপুর থেকে বাতাম ভ্রমণের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে বুই সিএনবিসিকে জানান, তাঁর কাছে ছুটি কাটানোর আরও একটি ভালো বিকল্প ভিয়েতনাম।
‘স্কোয়াক বক্স এশিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাস্টারকার্ডের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যান বলেন, এরই মধ্য়ে এশীয়দের জন্য নিজ অঞ্চলে ভ্রমণ করা আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান বিমানভাড়া অনেক এশীয় ভ্রমণকারীর বহন করা বেশ কঠিন। এই প্রবণতা কত দিন বজায় থাকবে, তা এখনো অনিশ্চিত হলেও ম্যান জানান, এটি মূলত তেল এবং জেট ফুয়েলের দাম বাড়তে থাকার ওপরই নির্ভরশীল।
মোটকথা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার জন্য এশিয়ার পর্যটকদের এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করা এই সময়ের সেরা বিকল্প। ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, চীন ইত্যাদি দেশ এখন নিরাপদ ভ্রমণ ও বাজেটের জন্য।
সূত্র: সিএনবিসি