ভ্রমণ এখন আর নিছক ঘুরে বেড়ানোর বিষয় নেই। এতে যোগ হয়েছে অনেক রকম বিষয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো খাবার। বলা চলে, ভ্রমণের বড় ভ্যালু অ্যাডেড ফিচার হয়ে উঠেছে খাবার। একজন পর্যটকের কাছে খাবারের পেছনের ইতিহাস, খাবারটির ঐতিহ্য, স্থানীয় উপাদান এবং খাঁটি আঞ্চলিক স্বাদ এখন মূল আকর্ষণ। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ‘টেস্ট অ্যাটলাস’ এর পর সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ বিশ্বজুড়ে খাবারের জন্য সেরা ১৫টি অঞ্চলের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় জায়গা পেয়েছে এশিয়া মহাদেশের চার অঞ্চল। তাই নিয়ে আয়োজন, স্বাদ ভ্রমণে এশিয়ার সেরা ৪।
২০২৫ সালের শেষের দিকে ইউনেসকোর ক্রিয়েটিভ সিটি অব গ্যাস্ট্রোনমির মর্যাদা অর্জন করেছে ভারতের লক্ষ্ণৌ। শহরটির রন্ধনশৈলীর শিকড় লুকিয়ে আছে মূলত সতেরো-আঠারো শতকের পারস্য ও মোগল রাজকীয় রান্নাঘরে। এখানকার খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর সুগন্ধ এবং রান্নার অনন্য কৌশল। ‘দম পুখত’ পদ্ধতিটি আজও লক্ষ্ণৌর রান্নার প্রধান স্তম্ভ। এই পদ্ধতিতে ভারী পাত্রে মাংস সিল করে একদম ঢিমে আঁচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রান্না করা হয়। এ ছাড়া এখানে আছে জাফরান সুবাসিত পোলাও এবং মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়ার মতো বিভিন্ন পদের কাবাব।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন অ্যারাবিকা কফির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক তখন ভিয়েতনামের রোবাস্টা কফির স্বর্গরাজ্য সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডস বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে। দেশটির ঢাক লাক প্রদেশের রাজধানী বুওন মা থুওত অঞ্চলটিকে বলা হয় ভিয়েতনামের কফি সংস্কৃতির হৃৎপিণ্ড। এখানে আক্ষরিক অর্থেই প্রতি ১০০ মিটারে একটি কফির দোকান পাওয়া যায়! ঐতিহ্যবাহী ফিন ফিল্টার থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘন কফি কখনো কনডেন্সড মিল্ক, কখনো সামান্য লবণ, আবার কখনো ডিমের কুসুম ফেটিয়ে তিরামিসুর মতো করে পরিবেশন করা হয়। এখানে আছে ওয়ার্ল্ড কফি মিউজিয়াম, যা কফিপ্রেমীদের জন্য অবশ্য দর্শনীয় স্থান।
মাত্র ৩০০ বর্গমাইলের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে রয়েছে ৩৮টি মিশেলিন-স্টার রেস্তোরাঁ এবং ইউনেসকো স্বীকৃত হাজারো হকার স্টল। তবে সিঙ্গাপুরের যে খাবারটি সম্প্রতি আলোড়ন তুলছে, তা হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী পেরানাকান খাবার। একসময় চীন ও ভারত থেকে আসা অভিবাসীরা স্থানীয় মালয় নারীদের বিয়ে করতেন। তখন এই হাইব্রিড পেরানাকান সংস্কৃতির জন্ম হয়। চীনা, মালয়েশিয়ান ও ইন্দোনেশিয়ান মসলার এক জটিল কিন্তু অপূর্ব মিশ্রণ ঘটে এই রান্নায়। তবে এই খাবার তৈরিতে প্রচুর সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। দ্য ইনটান নামের একটি হেরিটেজ হোমে গেলে এখনো খাঁটি পেরানাকান খাবার পাওয়া যায়। জনপ্রিয় কিছু খাবার হলো লাকসা, আয়াম বুয়াহ কেলুয়াক, ইনচি কাবিন, নোনিয়া কুয়েহ।
এ ছাড়া এশিয়ান ট্রাফল হিসেবে পরিচিত বুয়াহ কেলুয়াক বাদাম দিয়ে তৈরি চিকেন স্টুর স্বাদ নেওয়া যায় সিঙ্গাপুরে।
তুরস্কের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের এজিয়ান সাগরে অবস্থিত এই শান্ত ও সুন্দর দ্বীপটি খাদ্যসংস্কৃতির গোপন খনি। প্রাচীনকালে এটি ‘টেনেডোস’ নামে পরিচিত ছিল, যার উল্লেখ রয়েছে হোমারের ‘ইলিয়াড’-এ। শত শত বছর ধরে গ্রিক ও তুর্কি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এখানকার খাবার এক অনন্য রূপ নিয়েছে। দ্বীপের চারপাশের আঙুরপাতা দিয়ে মোড়ানো এবং কয়লার আগুনে ঝলসানো তাজা সার্ডিন মাছ কিংবা সকালের নাশতায় ঐতিহ্যবাহী টমেটো-বাদামের জ্যাম এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। এ ছাড়া খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে চলে আসা প্রাচীন ওয়াইন তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে এই দ্বীপে। এখানকার সংকীর্ণ পাথুরে রাস্তা আর চমৎকার সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া এক জাদুকরি অভিজ্ঞতা।
ভারতের লক্ষ্ণৌ হোক কিংবা ভিয়েতনামের সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডস অথবা সিঙ্গাপুর হোক কিংবা তুরস্কের বোজকাডা, যেখানেই যান স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। ‘টেস্ট অ্যাটলাস’ অথবা ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জায়গা তো রইলই, এবার নিজেই খুঁজে বের করুন আপনার পছন্দের জায়গাগুলো। সে সব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও যেমন হতে পারে, তেমনি হতে পারে নিজের দেশে। বেড়িয়ে পড়ুন আর পৃথিবীর সঙ্গে জুড়ে দিন নিজের পছন্দ ও ঐতিহ্য।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক