প্রযুক্তির এই যুগে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এর ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট কোনো একটা বয়সের নয়। তরুণ থেকে প্রবীণ—সবাই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বেশ সরব। তবে কিশোর-কিশোরীদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গভীর, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা আলোচনা চলছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং ডেকিন ইউনিভার্সিটির এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চালানো এই গবেষণার প্রতিবেদন ১১ জুন আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক জার্নাল ‘মেডিকেল জার্নাল অব অস্ট্রেলিয়া’য় প্রকাশ করা হয়েছে।
গবেষকেরা চাইল্ডহুড টু অ্যাডোলেসেন্স ট্রানজিশন স্টাডি প্রকল্পের অধীনে মেলবোর্ন এলাকার ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিশুর ওপর ৯ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিবছর নজরদারি চালান। গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী যেসব কিশোর-কিশোরী দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, এক বছর পর তাদের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ এবং সুখের অনুভূতি বা হ্যাপিনেস লেভেল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যারা দিনে এক ঘণ্টার কম সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের তুলনায় এই ঝুঁকি অনেক বেশি। এই নেতিবাচক প্রভাব বেশি দেখা গেছে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী কিশোরীদের ক্ষেত্রে, যারা মাত্র বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছে। গবেষকদের মতে, বয়ঃসন্ধির শুরুতে কিশোর-কিশোরীরা সহপাঠী বা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজেদের শারীরিক ও সামাজিক ইমেজ নিয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল থাকে। ফলে অনলাইনে একে অপরের সঙ্গে তুলনা, সাইবার বুলিং এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার কারণে দ্রুত মানসিক অবসাদে ভোগে। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ছোট ঝুঁকিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বর্তমান প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ একসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে।
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট এবং ইউটিউবের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে অ্যাকাউন্ট তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার নীতিমালার পর এই গবেষণার ফল প্রকাশ পেল। তবে গবেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়াকে ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করাই একমাত্র সমাধান নয়। কারণ, অনেক কিশোর-কিশোরী এর মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ পায়। এটি যেমন সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নয়, তেমনি একে পুরোপুরি নিরাপদও বলা যায় না। তাই বয়স-উপযোগী ব্যবহার, ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতামূলক শিক্ষা এবং অভিভাবকদের স্পষ্ট নির্দেশনাই এর আসল সমাধান।
এই পরিস্থিতিতে সন্তানদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবেন, তা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সুরক্ষায় বড় হাতিয়ার হলো যত্নশীল অভিভাবক। তাঁদের সঙ্গে সন্তানদের মজবুত ও বিশ্বস্ত সম্পর্কই সমস্যার সমাধান এনে দেয়। সন্তানের সঙ্গে সেই বন্ধন আরও দৃঢ় করে তুলুন। এ জন্য যা করতে পারেন—
উপযুক্ত সময় বেছে নিন: কোনো পারিবারিক খাবার বা হাঁটার সময় স্বাভাবিকভাবে আলোচনা শুরু করুন। তাদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তোমার ও তোমার বন্ধুদের ভাবনা কী?
তাদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করুন: সোশ্যাল মিডিয়া কিশোর-কিশোরীদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার এবং দলগত বন্ধন তৈরির বড় মাধ্যম। তাই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তারা রাগ বা হতাশা প্রকাশ করলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিক নিয়েই প্রশ্ন করুন।
সন্তানের মতামতকে মূল্য দিন: সন্তানদের বোঝান যে তাদের কোনো ভুলের জন্য নয়, বরং টেক কোম্পানিগুলো শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার এই নিয়মগুলো নিয়ে ভাবছে। তাদের মতামত জানতে চান, তুমি কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির মালিক হলে তরুণদের সুরক্ষায় কী করতে?
যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা করুন: বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যদি অ্যাপের ব্যবহার কমে যায়, তবে মোবাইল ফোনে কথা বলা, টেক্সট করা কিংবা সরাসরি দেখা করা, স্কুল ক্লাব বা খেলাধুলার মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখার পরিকল্পনা একসঙ্গে করুন।
সুস্থ অভ্যাস গড়ে তুলুন: প্রযুক্তির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারের জন্য পরিবারে কিছু নিয়ম তৈরি করুন। যেমন পড়ার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা বা রাতে ঘুমানোর সময় শোয়ার ঘরের বাইরে ডিভাইস রাখা।
সূত্র: বিবিসি, ইউনিসেফ