বিশ্বজুড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতিকে খাদ্য কীভাবে প্রভাবিত করে, তা ক্যামেরাবন্দী করার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হলো ‘ওয়ার্ল্ড ফুড ফটোগ্রাফি’। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ফুড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর সেরা দশটি বিজয়ী ছবির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এবার এই বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার একটি চমৎকার ছবি।
২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ৯ হাজার ছবি জমা পড়েছিল। এসব ছবিতে ফসল কাটা, ঐতিহ্যবাহী বাজার, পারিবারিক রান্নাঘর, স্ট্রিট ফুড, উৎসব এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের মতো নানা বৈচিত্র্যময় বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন আলোকচিত্রীরা।
প্রতিযোগিতার ‘ফুড ফর সেল’ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী কাজী মোহাম্মদ গোলাম কুদ্দুস। তাঁর ক্যামেরায় উঠে এসেছে বগুড়ার একটি পাইকারি সবজি বাজারের ভোরবেলার ব্যস্ত দৃশ্য। ছবিটিতে দেখা যায়, স্থানীয় কৃষকেরা ভ্যানে করে তাঁদের খেতের সদ্য তোলা টাটকা বাঁধাকপি বাজারে নিয়ে আসছেন, যা পরবর্তীতে পাইকারেরা কিনে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরগুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। বগুড়ার সাধারণ মানুষের এই চিরচেনা জীবনসংগ্রাম ও খাদ্য সরবরাহের চিত্রটি আন্তর্জাতিক বিচারকদের নজর কেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের আলোকচিত্রী জো কার্নি এই বছরের মূল বিজয়ী হয়েছেন। তাজিকিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চলের সোভিয়েত আমলের একটি পুরোনো স্যানাটোরিয়ামের (স্বাস্থ্যনিবাস) ক্যানটিনে একাকী বসে খাবার খাওয়ার একটি মুহূর্ত তিনি ক্যামেরাবন্দী করেন, যা স্মৃতিকাতরতা ও স্থানের আবহকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ফুড ফর সেলিব্রেশন (চীন): চীনের পিংইয়াও সং এই ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর ছবিতে চীনের একটি হটপট উৎসবে শত শত মানুষের একসঙ্গে বসে ঐতিহ্যবাহী লাল ঝোলের (ব্রথ) ভোজ উপভোগ করার এক অনন্য দৃশ্য উঠে এসেছে।
ক্রিম অব দ্য ক্রপ (স্পেন): জাপানের কিয়োটোর একটি জেলেপল্লিতে ঐতিহ্যবাহী ‘হিমোনো’ পদ্ধতিতে রোদে স্কুইড শুকানো হচ্ছে। এই দারুণ দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করে বিজয়ী হয়েছেন স্পেনের আলবার্ট গঞ্জালেস।
ব্রিং হোম দ্য হারভেস্ট (নেদারল্যান্ডস): কলকাতার হাওড়া ব্রিজের নিচে হুগলি নদীতে ভোরবেলায় জেলেদের জাল টানার এই শান্ত ও স্নিগ্ধ দৃশ্য ধারণ করে বিজয়ী হয়েছেন নেদারল্যান্ডসের মার্কো রুটেন।
স্ট্রিট ফুড (অস্ট্রেলিয়া): জাপানের কিয়োটোর বিখ্যাত নিশিকি মার্কেটের উপচে পড়া ভিড় ও ধোঁয়া ওঠা খাবারের ছবিটি তুলে বিজয়ী হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার কারা বেয়ার্ড।
লুই জাদো ওয়াইন ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার (স্পেন): মাটির নিচের একটি ওয়াইন ট্যাংকের ভেতরের দেওয়ালে জমে থাকা দাগ পরিষ্কার করার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে বিজয়ী হয়েছেন স্পেনের মিগুয়েল ওর্তুনিও মার্টিনেজ।
ফুড ফর দ্য ফ্যামিলি (ইতালি): উজবেকিস্তানের সমরখন্দে পারিবারিক তন্দুর থেকে সদ্য বের করা হয়েছে গরম নান রুটি। তা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছে একটি শিশু। মুহূর্তটি ধারণ করে বিজয়ী হয়েছেন ইতালির মিশেলা বালবোনি ও ফেদেরিকো বোরেলা।
জেমি অলিভার ইয়ুথ প্রাইজ (১৩-১৭ বছর): ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ছট পূজার সময় সূর্য দেবতার উদ্দেশে নানা ধরনের খাবার উৎসর্গ করে জলে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পাঠ করেন নারীরা। এই ভক্তিপূর্ণ ছবিটি তুলে ‘জেমি অলিভার ইয়ুথ প্রাইজ’ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছে ১৮ বছর বয়সী আইরিশ ফটোগ্রাফার ইন্ডিগো লারমুর।
দ্য ফিলিপ হারবেন অ্যাওয়ার্ড ফর ফুড ইন অ্যাকশন (হাঙ্গেরি): ওয়ার্ল্ড ফুড ফটোগ্রাফির ‘দ্য ফিলিপ হারবেন অ্যাওয়ার্ড ফর ফুড ইন অ্যাকশন’ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন হাঙ্গেরিয়ান আলোকচিত্রী লেহোচকি বালাজ।
বালাজ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দাদা-দাদির একটি ছবি তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে তিনি মনে করতেন, তাঁদের মতো মানুষের ছবি তোলার যোগ্যতা তিনি এখনো অর্জন করেননি। অবশেষে তিনি যখন দাদা-দাদির ছবি তোলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর দাদি প্রথমে সুন্দর করে চুল সাজিয়ে নেন ও দাদা দাড়ি কামিয়ে নেন। এরপর তিনি তাঁদের রান্নাঘরে ক্যামেরা স্থাপন করে ছবিটি ধারণ করেন।
খাবারের ছবি কেবল ক্ষুধা বা রুচি বাড়ানোর মাধ্যম নয়। একটি ছবি একই সঙ্গে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনজীবনকেও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার অনন্য মাধ্যম।
তথ্যসূত্র: বিবিসি