গ্রীষ্মের সকাল তখন পুরোপুরি তীব্র হয়ে ওঠেনি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে দিনের শুরুটা হতো সংযত ছন্দময়। এই সময়ের জলখাবার কখনোই ভারী নয়; বরং এমনভাবে সাজানো, যাতে শরীর ধীরে ধীরে দিনের গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। তবে গরমকালে জলখাবারে থাকত ঠান্ডা বা কম গরম দুধ, সঙ্গে মুড়ি কিংবা কখনো কখনো দুধ-ভাতের সহজ আয়োজন। গ্রীষ্মকালীন ফল (পাকা আম, কলা, শসা) সকালের থালায় উপস্থিত থাকত। কখনো বিদেশি খাবারও থাকত। অ্যাসপারাগাসের স্যান্ডউইচ অথবা অ্যাসপারাগাস স্যুপ দিয়েও দিন শুরু হতো কোনো কোনো সময়। দিনের শুরুতে পেট ভরানো নয়, বরং শরীর প্রস্তুত করা।
চিত্রা দেবের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, অন্দরমহলে সবার আহার ছিল নিভৃত, প্রায় অনাড়ম্বর; কিন্তু তার মধ্যেই ছিল পরিমিতি আর পুষ্টির ভারসাম্য।
মধ্যাহ্নভোজ ছিল ঠাকুরবাড়ির খাদ্যসংস্কৃতির স্পষ্ট প্রতিফলন। শুরু হতো তেতো দিয়ে—সুক্তো বা করলা ভাজা বা নিমপাতার কোনো পদ। এর মধ্যে নিমগুঁড়া, নিম শুকনা, নিম ঝোল, নিম বেগুন ছেঁচকি, নিমে-শিমে ছেঁচকি, নিমের কারি-শুক্তানি অন্যতম। এরপর সাদা ভাতের সঙ্গে আসত পাতলা ডাল বা আম ডাল। আম দিয়ে ডাল ছাড়াও কাঁচা আম দিয়ে শামি কাবাব, কাঁচা আমের স্যালাড, কাঁচা আমের মাটন কারি, কাঁচা আমের ও আম পোড়ার মিষ্টি শরবত, পাকা আম ভাতে, আমের পুডিং ইত্যাদি খাবারও তৈরি হতো। থাকত লাউ, ঝিঙে আর পটোলের মতো হালকা সবজির কোনো পদ। কখনো আলু পোস্ত খুবই সংযত মসলায় রান্না করা।
এই সবজির যে কত রকমফের ছিল, সে নিয়ে অবাক হয়ে যেতে হয়। পটোল দিয়ে হতো পটোল পোড়া, পটোলের দানার নোনা মালপোয়া, পটোলের করমচি, পটোল আলুর হিঙ্গি, পাকা পটোলের ঝুরঝুরে অম্বল ইত্যাদি। শসা দিয়ে হতো পাকা শসার ডালনা অথবা কারি, শসা ভাতে, শসার অম্বল। এঁচোড়ের হিঙ্গি, এঁচোড় দিয়ে অড়হর ডাল, শজনে শাকের তেলশাক, শজনে শাক চচ্চড়ি—আরও কত কিছু! লাউ দিয়ে হতো লাউয়ের পুডিং, লাউ কাঁকড়া, লাউয়ের স্যালাডসহ নানা রকম রান্না।
এই সব পদে তেল-মসলার বাহুল্য নেই; বরং জলের ভাগ বেশি, স্বাদে মৃদু, চোখের শান্তি। বেশির ভাগ রান্নাই কম তেলে, কম ঝালে। এই ধারার সঙ্গে নানান রকম মাছের পদও থাকত। কখনো কখনো পাঁঠার মাংসও থাকত। রুই মাছের কাঁচা আম দিয়ে স্টু, শিং মাছের স্টু, মাগুর মাছের হিঙ্গি, বেগুন দিয়ে মাছের ডালনা, মুরগি; আবার পাঁঠার মাংসও রান্না করা হতো একেবারেই ঋতু উপযোগী, স্বাস্থ্যকর ও সহজপাচ্য উপায়ে।
খাবারের শেষ পর্বে থাকত নানা ধরনের চাটনি বা অম্বল এবং দই, যা গরমের দিনে অপরিহার্য। কখনো থাকত ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলে তৈরি হালকা মিষ্টির সন্দেশ; যা ছিল মধ্যাহ্নভোজন সমাপ্তির এক সংযত স্পর্শ।
বিকেলের জলখাবারও ছিল আড়ম্বরহীন কিন্তু গভীরভাবে ঋতুসচেতন। কাঁসার কিংবা পিতলের গ্লাসে ঢেলে রাখা দইয়ের ঘোল, বেলের অথবা লেবুর শরবত, আবার কখনো মৌসুমি ফলের শরবতেরও ব্যবস্থা থাকত। এ ছাড়া কখনো কখনো থাকত জামবাটিতে মুড়ি, সামান্য নারকেলকুচি আর কাঁচা মরিচের ছোঁয়া। সঙ্গে কোনো ফল।
শোনা যায়, এই সব রান্নার সঙ্গে সঙ্গেই, রাতের খাবারে, কখনো কখনো বিদেশি ছোঁয়াও থাকত। পাতলা স্টু, পুডিং, দই, নানা ধরনের পায়েস, দুধের তৈরি নানান রকম মিঠাইও স্বমহিমায় শোভা পেত ঠাকুরবাড়িতে।
সূত্র: চিত্রা দেবের ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ এবং প্রজ্ঞা সুন্দরী দেবীর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’