আজকাল অবসর মানেই স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা। আর ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে রিলস স্ক্রল করতে করতেই আমাদের চোখে পড়ে নজরকাড়া সব বিউটি হ্যাকস। কাচের মতো স্বচ্ছ ত্বক বা মুহূর্তেই চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠার জাদুকরি সব টিপস দেখে আমরা সহজে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্যামেরার ফিল্টারে যা নিখুঁত দেখায়, বাস্তবে তা সব সময় কাজ করে না। বিশেষ করে বাংলাদেশে ভ্যাপসা গরম আর ধুলাবালুর মধ্যে এসব বিদেশি ট্রেন্ড অন্ধভাবে মেনে চলা অনেকটাই নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনার মতো।
এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছিলাম কসমেটোলজিস্ট ও শোভন মেকওভারের স্বত্বাধিকারী শোভন সাহার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অন্যের দেখাদেখি ট্রেন্ডে গা না ভাসিয়ে নিজের ত্বকের ধরন বোঝাটা বেশি জরুরি। কিছু ট্রেন্ড আসলে আমাদের ত্বকের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করছে।’
গ্লাস স্কিনের মোহ
কোরিয়ান নারীদের মতো উজ্জ্বল এবং পোরলেস গ্লাস স্কিন পাওয়ার জন্য আমরা এখন পাগলপ্রায়। এই লুক পেতে একের পর এক সেরাম ও ময়শ্চারাইজার ত্বকে মাখতে হয়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশের আবহাওয়া আর কোরিয়ার আবহাওয়া একেবারেই ভিন্ন। শোভন সাহা বলেন, ‘আমাদের দেশের অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও গরমে ত্বকে তেলের উৎপাদন এমনিতেই বেশি হয়। এর ওপর স্তরে স্তরে ভারী সব প্রসাধনী পণ্য ব্যবহার করলে রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ এবং র্যাশের সমস্যা বেড়ে যায়।’ ত্বক চর্চার জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রসাধনী ব্যবহারের ফলে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তর বা স্কিন ব্যারিয়ার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।
রান্নাঘরের উপকরণের ভুল ব্যবহার
ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম খুললেই দেখা যায়, টুথপেস্ট দিয়ে ব্রণের চিকিৎসা কিংবা বেকিং সোডা ও লেবুর রস দিয়ে ত্বক ফরসা করার টিপস। এগুলো আসলে বিউটি হ্যাকস নয়, বরং ত্বকের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। লেবুর রস বা সোডা ত্বকের প্রাকৃতিক পিএইচ ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যা থেকে জ্বালাপোড়া বা পিগমেন্টেশন হতে পারে। আমাদের দেশের মানুষের ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ বেশি থাকে।
তাই এসব ঘরোয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী কালো দাগ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শোভন সাহা জানান, ঘরোয়া যেকোনো কিছু ত্বকে ব্যবহার করার আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
রাতারাতি উজ্জ্বল ত্বক পেতে চাওয়া
বিউটি ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রায়ই দাবি করেন, প্রতিদিন স্ক্রাবিং কিংবা অ্যাসিড এক্সফোলিয়েশন করলে ত্বক উজ্জ্বল হয়ে যাবে। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত স্ক্রাবিং ত্বকের ওপরের পাতলা আবরণটি তুলে ফেলে। ফলে ত্বক রোদে আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে প্রাকৃতিকভাবে রোদ প্রখর হয়। এমন রোদে সংবেদনশীল ত্বক নিয়ে বের হলে তাতে সানবার্ন ও বলিরেখা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি। শোভন সাহা বলেন, ‘সপ্তাহে বড়জোর দুবার এক্সফোলিয়েশন এবং নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারই আপনার ত্বকের জন্য যথেষ্ট।’
১০ ধাপের জটিল সব রুটিন
টোনার, সেরাম, এসেন্স, অ্যাম্পুল—একের পর এক পণ্য ব্যবহারের এই ১০ ধাপের রুটিন এখন বেশ জনপ্রিয়। এটি যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি আমাদের দেশের আবহাওয়ার জন্যও অনুপযোগী। এত সব রাসায়নিকের ভিড়ে ত্বক নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে ব্রেকআউট কিংবা ব্রণের সমস্যা বেড়ে যায়। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের যত্ন হওয়া উচিত সাধারণ এবং বিজ্ঞানসম্মত। ক্লিনজার, ময়শ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন—এই তিনটি মৌলিক ধাপ মেনে চলাই কার্যকর।
অন্ধ অনুসরণ নয়
শোভন সাহা বলেন, ‘কোনো বিউটি প্রোডাক্ট ভাইরাল হয়েছে কিংবা আপনার প্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার সেটি ব্যবহার করছেন মানেই যে তা আপনার ত্বকের জন্য ভালো হবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই।’ তবে মনে রাখতে হবে, এসব কনটেন্টের বড় অংশ স্পনসরড বা বিজ্ঞাপন। ইনফ্লুয়েন্সাররা আপনার ত্বকের ধরন কিংবা জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্বকের যত্নের যেকোনো পণ্য কাজ শুরু করতে কমপক্ষে ২১ দিন সময় নেয়। সে কারণে রাতারাতি জাদুকরি ফল আশা করা এবং নিজের ত্বকের ধরন না বুঝে এসব পণ্য ব্যবহার করা কোনোভাবেই ঠিক নয়।
তাই বিউটি ইনফ্লুয়েন্সারদের অন্ধভাবে অনুকরণ করতে যাবেন না। সৌন্দর্য চর্চা করতে হলে প্রথমে একজন ত্বক বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শ নিয়ে আপনার ত্বকের ধরন বুঝে নিন। তারপর ত্বক বা রূপবিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নির্দিষ্ট পণ্য ব্যবহার করতে হবে।
১০ ধাপের স্কিন কেয়ার রুটিন এখন বেশ জনপ্রিয়। এটি যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি আমাদের আবহাওয়ার জন্যও অনুপযোগী।