ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ বরাবরই সেরা তারকাদের পায়ের জাদু আর মাঠের লড়াইয়ের জন্য চেনা। এবারের বিশ্বকাপেও তাই মাঠের ফুটবলটা মূলত আগের মতোই থাকছে—সেটি গোল, ড্রিবলিং, ট্যাকটিকস আর মাঠের রোমাঞ্চের চিরচেনা সেই খেলা। তবে ম্যাচের ভেতরের প্রতিটি সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত বিতর্কহীন করতে এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দিতে এ বছরের ফুটবল বিশ্বকাপের আসর হতে যাচ্ছে ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি মেলা! তাই বলা চলে, এবারের আসরটি শুধু খেলোয়াড়দের দক্ষতারই নয়, প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব প্রদর্শনীর সাক্ষী হতে চলেছে। তিন দেশের ১৬টি শহর, ৪৮টি দলের মোট ১০৪টি ম্যাচ। এই বিশাল মহাযজ্ঞ নির্বিঘ্ন, নিখুঁত এবং আরও আকর্ষণীয় করতে স্টেডিয়ামের কোনায় কোনায় এবার জড়িয়ে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি।
এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বল ট্রিওন্ডা। এর অর্থ তিন তরঙ্গ। বাইরে থেকে এটি শুধুই চার প্যানেলের একটি নিখুঁত বল মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে চমক। বলটির ভেতরে যুক্ত করা হয়েছে ৫০০ হার্টজের একটি বিশেষ সেন্সর। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের ঘূর্ণন, গতি এবং ত্রিমাত্রিক অবস্থানের নিখুঁত ডেটা সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি সিস্টেমে পাঠাবে। খেলোয়াড়ের পায়ে বা হাতে বলের সামান্যতম ছোঁয়া বা বিচ্যুতিও এই সেন্সরের মাধ্যমে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ডেটা স্পাইক হিসেবে ধরা পড়বে। ফলে হ্যান্ডবল বা অফসাইডের মতো জটিল সিদ্ধান্তগুলো হবে শতভাগ নিখুঁত।
বিশ্বকাপের ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেকের শরীর মাত্র ১ সেকেন্ডে ডিজিটাল স্ক্যান করে একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মডেল বা অবতার তৈরি করা হয়েছে। মাঠে খেলোয়াড়দের অফসাইডের সিদ্ধান্ত আরও নিখুঁত এবং দর্শকদের কাছে তা বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলতে কাজ করবে লেনোভোর থ্রিডি প্লেয়ার অবতার। খেলার সময় বলের সেন্সর এবং মাঠের ট্র্যাকিং ক্যামেরার সঙ্গে এই অবতারগুলো সিঙ্ক বা যুক্ত করা হবে। এর ফলে খেলোয়াড়দের দ্রুততম বা বাধাগ্রস্ত নড়াচড়াও এআই নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে পারবে। ভিএআর কোনো সিদ্ধান্ত নিলে, সেই মুহূর্তের একটি জীবন্ত থ্রিডি অ্যানিমেশন স্টেডিয়াম এবং টিভির পর্দায় দ্রুত সম্প্রচার করা হবে।
মেক্সিকোর মন্তেরেই অঞ্চলের গুয়াদালুপে শহরের কাউন্সিল এলাকার স্টেডিয়ামগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার মাঠে থাকছে রোবট কুকুর। আল জাজিরা ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই মিলিয়ন পেসো মূল্যের এই চারপেয়ে প্রাণীর মতো রোবটগুলো মূলত পুলিশ বাহিনীর সুরক্ষায় কাজ করবে। যেকোনো ধরনের সংঘর্ষ বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই রোবটগুলো আগে প্রবেশ করবে এবং ভেতর থেকে সরাসরি লাইভ ভিডিও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পাঠাবে।
লাইনসম্যানের অফসাইড ফ্ল্যাগ তোলার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার দিন এবার শেষ হতে চলেছে। ফিফা এবার আরও উন্নত ও দ্রুতগতির সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে। আগে যেখানে শুধু ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড হলে রেফারি সতর্কবার্তা পেতেন, এবার তা কমিয়ে মাত্র ১০ সেন্টিমিটারে আনা হয়েছে। বলের সেন্সর এবং খেলোয়াড়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে এআই চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি রেফারির ইয়ারপিসে অডিও অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেবে। তবে পজিশনাল অফসাইড নির্ধারণে এটি কাজ করলেও কোনো খেলোয়াড় খেলায় বাধা দিচ্ছে কি না, এমন সাবজেক্টিভ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এর নেই।
বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচে এবার রেফারিদের শরীরে ক্যামেরা যুক্ত থাকবে। এর ফলে রেফারিরা মাঠের ঠিক কোন পজিশন থেকে কী দেখছেন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁদের চলাফেরা প্রথম পক্ষ বা ফার্স্ট-পারসন পারস্পেকটিভ থেকে দর্শকেরা দেখতে পাবেন। এটি ম্যাচ পরিচালনার স্বচ্ছতা বাড়াতে দারুণ সাহায্য করবে।
অতীতে ধনী ফুটবল ফেডারেশনগুলো নিজস্ব অ্যানালিটিক ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা পেত। কিন্তু এবার লেনোভোর ফুটবল এআই প্রো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফিফা সব দলকে সমান সুযোগ করে দিচ্ছে। ফিফার পেটাবাইট সমপরিমাণ ঐতিহাসিক ডেটা, খেলোয়াড়দের গতি ও ট্যাকটিক্যাল অ্যানালাইসিস নিয়ে তৈরি এই এআই ফ্যাক্টরি সব দলকে রিয়েল-টাইমে প্রতিপক্ষের কৌশল বুঝতে এবং খেলোয়াড়দের ক্লান্তি মেপে পরিবর্তনের পরামর্শ দেবে। ফলে মাঠের লড়াই প্রযুক্তির চেয়ে কৌশলেই নির্ধারিত হবে।
১৬টি স্টেডিয়ামের ব্যবস্থাপনা ত্রুটিমুক্ত রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি। এটি মূলত স্টেডিয়ামগুলোর হুবহু একটি ভার্চুয়াল প্রতিরূপ বা মানচিত্র। স্টেডিয়ামের কোনো গেটে দর্শকদের ভিড় বা জটলা তৈরি হলে তা সঙ্গে সঙ্গে এই ম্যাপে ধরা পড়বে। এমনকি সাধারণ দর্শকেরাও মোটোরোলা বা লেনোভো ডিভাইসের মাধ্যমে এই ডিজিটাল টুইন ব্যবহার করে স্টেডিয়ামের ভেতরে নিজের সিট, পানির বুথ বা শহরের ল্যান্ডমার্কের লাইভ আপডেট দেখে পথ খুঁজে নিতে পারবেন।
স্টেডিয়ামের বাইরে থাকা দর্শকদের জন্য এবার হাইসেন্স নিয়ে এসেছে বিশেষ এক্সআর১০ প্রজেক্টর। এটি তীব্র আলোতেও ৩০০ ইঞ্চির ফোর-কে উজ্জ্বল ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারে। এ ছাড়া বড় স্ক্রিনের ইউএক্সএ টিভিতে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে খেলা দেখার পাশাপাশি স্ক্রিনেই লাইভ হিট ম্যাপ, খেলোয়াড়দের জীবনী এবং লাইনআপের পরিবর্তন দেখা যাবে। এমনকি গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচগুলোতে একই সঙ্গে তিনটি ম্যাচ ফোর-কে রেজল্যুশনে দেখার সুযোগও থাকবে এতে।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, টেকনোলজি ম্যাগাজিন