ঘড়ি আবিষ্কারের শুরুর দিকে মানুষ মূলত পকেট ঘড়ি ব্যবহার করত। পরে যুদ্ধক্ষেত্রে বা জরুরি প্রয়োজনে সময় দেখার সুবিধার্থে মানুষ কবজিতে ঘড়ি পরা শুরু করে। এর পর থেকে একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে, ঘড়ি বাঁ হাতেই পরতে হবে। কিন্তু আপনি চারপাশের মানুষের দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে দেখবেন, অনেকে সেই চিরায়ত নিয়ম ভেঙে ডান হাতে ঘড়ি পরছেন। কিন্তু কেন বেশির ভাগ মানুষ বাঁ হাতে ঘড়ি পরে আর কিছু মানুষ ডান হাত বেছে নিল ঘড়ি পরার জন্য; তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। ডান হাতে ঘড়ি পরা দেখলে প্রথমে, একটিকে ব্যক্তিগত পছন্দ বা শখ মনে হতেই পারে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে নানান সমীকরণ।
ইতিহাসের পাতায় বাঁ হাতের আধিপত্য
বাঁ কবজিতে ঘড়ি পরার চল শুরু হওয়ার পেছনে রয়েছে বিশ শতকের শুরুর দিকের এক বিশেষ যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা। সে সময় ঘড়িগুলো এখনকার মতো ব্যাটারিচালিত বা অটোমেটিক ছিল না, বরং সেগুলো ছিল ম্যানুয়াল উইন্ডিং। অর্থাৎ, ঘড়ির ডান পাশে থাকা একটি ছোট নব বা ক্রাউন ঘুরিয়ে দম দিতে হতো। যেহেতু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ডানহাতি, তাই বাঁ হাতে ঘড়ি পরে ডান হাত দিয়ে দম দেওয়া ছিল সবচেয়ে সহজ। এই যান্ত্রিক প্রয়োজনেই বাঁ হাতে ঘড়ি পরার প্রথাটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাঁহাতি মানুষের পছন্দ
পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ বাঁহাতি। বাঁ হাতে লেখালেখি করা, কোনো কিছু ধরা বা ভারী কাজ করার সময় ঘড়ি থাকলে তা কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া ঘড়ির কাচ ফেটে যাওয়া বা স্ক্র্যাচ পড়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। এই ব্যবহারিক অসুবিধা এড়াতে বাঁহাতি মানুষেরা ডান হাত বেছে নেয় ঘড়ি পরার জন্য।
স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, যারা ডান হাতে ঘড়ি পরে, তাদের মধ্যে একধরনের ‘নিয়ম ভাঙার’ প্রবণতা থাকে। তারা সাধারণত সৃজনশীল ও স্বাধীনচেতা স্বভাবের হয়ে থাকে। সমাজ যেটিকে স্বাভাবিক বলে ভাবে, তারা সেভাবে কাজ না করে নিজের মতো কাজ করতে পছন্দ করে। এটি তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ। অনেকে একে কনট্রারিয়ান আচরণও বলে থাকে। এই মানুষগুলো ভিড়ের মধ্যে নিজের একটি আলাদা ভাবমূর্তি তৈরিতে পছন্দ করে। অনেক সময় প্রথা ভেঙে ডান হাতে ঘড়ি পরাটা তাদের আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই কাজ করে।
পেশাগত কারণ
কিছু বিশেষ পেশার মানুষের জন্য বাঁ হাতে ঘড়ি পরাটা বেশি সুবিধাজনক। যাঁরা সারা দিন কি-বোর্ডে কাজ করেন বা মাউস ব্যবহার করেন (ডান হাতে), তাঁরা হাতের ভারসাম্য বজায় রাখতে বা ঘর্ষণ এড়াতে হাতে ঘড়ি পরেন না অথবা হাত পরিবর্তন করেন। আবার কিছু অ্যাথলেট বা টেনিস খেলোয়াড় তাঁদের সক্রিয় হাতের কবজিকে ভারমুক্ত রাখতে অন্য হাতে ঘড়ি পরতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। এ ছাড়া অনেক সময় চিকিৎসাগত কারণে বাঁ কবজিতে সমস্যা থাকলে ডান হাতই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
ফ্যাশন স্টেটমেন্ট
বর্তমান যুগে ঘড়ি শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়, বরং এটি অলংকারও বটে। ফ্যাশন দুনিয়ায় এখন ‘অপ্রতিসম’ বা আসিমেট্রিক্যাল লুক বেশ জনপ্রিয়। ডান হাতে দামি ঘড়ি এবং বাঁ হাতে ব্রেসলেট বা অন্য কোনো অনুষঙ্গ পরে অনেকে নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশ করে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সব সময় ডান হাতে ঘড়ি পরতে দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে এই স্টাইলকে একটি আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
ঘড়ি কোন হাতে পরবেন, তার ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। এটি সম্পূর্ণভাবেই ব্যবহারকারীর আরাম, সুবিধা ও ব্যক্তিত্বের ওপরে নির্ভর করে। আপনি যদি ডান হাতে ঘড়ি পরে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এবং সেটি আপনার ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, তবে প্রথা ভাঙার সৌন্দর্যেই লুকিয়ে আছে আসল সার্থকতা।
সূত্র: ব্রিটানিকা, নিউইয়র্ক টাইমস ও লাইফস্টাইল এশিয়া