টিকটক, এক্স বা গুগলের সার্চ রেজাল্টে এআইয়ের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের নিজস্ব কৌতূহল আর প্রশ্ন করার অভ্যাস হারিয়ে গেলে মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে মানুষ নিজেই তার বুদ্ধিমত্তা হারাবে।
প্রযুক্তির কল্যাণে এখন যেকোনো জটিল প্রশ্নের উত্তর মিলছে চোখের পলকে। গুগল সার্চের ওপরের পাতায় থাকা ‘এআই ওভারভিউ’ কিংবা চ্যাটবটের এক লাইনের উত্তর আমাদের জীবন সহজ করে দিয়েছে মনে হয়। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিরাট আশঙ্কার কথা। তা হলো, মানুষের বুদ্ধিমত্তা কি গিলে খাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? এমন প্রশ্ন উঠছে চারদিকে। অতিমাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, কৌতূহল এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাস চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। এবার এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রিনিচ। এর সিইও প্যাডি রজার্স গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইনস্ট্যান্ট বা তাৎক্ষণিক উত্তরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা মানুষের প্রশ্ন করার সংস্কৃতি, তথ্য যাচাইয়ের মানসিকতা এবং নতুন কিছু জানার কৌতূহল কমিয়ে দিচ্ছে; যা মূলত যেকোনো উদ্ভাবন বা দক্ষতার মূল ভিত্তি।’
রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচের ৩৫০ বছরের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের প্রকল্প ‘ফার্স্ট লাইট’-এর উদ্বোধনে রজার্স ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, ইতিহাসের বড় বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার শুধু প্রযুক্তির জোরে হয়েছে, এমন নয়। এর সঙ্গে ছিল মানুষের অদম্য কৌতূহল এবং নিজে উত্তর খোঁজার চেষ্টা। অতীতের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের কোটি কোটি ডেটা লিখে রেখেছিলেন। এই কাজ সেই সময়ে কোনো যন্ত্র বা রোবট করত না। কারণ, তখন এর তাৎক্ষণিক কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তাদের সেই ‘অপ্রয়োজনীয়’ মনে হওয়া খাতাগুলোই ৩৫০ বছর পর এসে পৃথিবীর নৌচলাচলের নানা তত্ত্ব প্রমাণে বড় সম্পদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এআই শুধু সুনির্দিষ্ট ডেটা দিতে পারে। কিন্তু গবেষণার সময় মানুষের সামনে আচমকা চলে আসা কোনো ‘অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু চমকপ্রদ তথ্য’ খুঁজে বের করার ক্ষমতা এআইয়ের নেই।
রজার্স এআইয়ের সঙ্গে উইকিপিডিয়ার মতো আগের ইন্টারনেট টুলগুলোর তুলনা করে একটি চমৎকার পয়েন্ট দেখিয়েছেন। আগে উইকিপিডিয়া বা কোনো সাইটে তথ্য খুঁজলে মানুষ তার মূল উৎস বা রেফারেন্স লিংক দেখতে পেত। অর্থাৎ তথ্য নিজে যাচাই করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানের জেনারেটিভ এআই কাস্টমারকে সরাসরি একটি সংক্ষিপ্ত সারমর্ম বা উত্তর দিয়ে দেয়। ফলে মানুষ তথ্যের মূল উৎস থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে তথ্যটি আদৌ নির্ভরযোগ্য কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকছে না। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের তথ্য ব্যবস্থা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. আনুশকা স্মিথ একে বলছেন ‘কগনিটিভ আউটসোর্সিং’ বা চিন্তাভাবনা ধার দেওয়া। তিনি বলেন, ‘এআই মানুষের মতো করে কাজ করতে পারায় মানুষ এখন পড়াশোনা, কাজ বা বিনোদনের ক্ষেত্রে নিজের মস্তিষ্ক খাটানো বা চিন্তা করার কষ্টটুকু করা ছেড়ে দিচ্ছে। এর ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে’।
রয়্যাল অবজারভেটরির এই সতর্কবার্তার মানে এই নয় যে এআই বিজ্ঞানের ক্ষতি করছে; বরং এর উল্টো উদাহরণও ভূরি ভূরি। ২০২৪ সালে গুগলের ডিপমাইন্ডের প্রধান ডেমিস হাসাবিস তাঁর তৈরি এআই ‘আলফাফোল্ড-২’ এর মাধ্যমে প্রোটিনের গঠন নিখুঁতভাবে অনুমান করে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যানের মতে, এআইকে আমাদের চিন্তাভাবনার ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। যেমন আমি একটি আইডিয়া ভাবলাম, এরপর এআইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার এই আইডিয়ার মধ্যে কী কী ভুল আছে, তা খুঁজে বের করো’। অর্থাৎ, নিজের চিন্তাকে আরও ধারালো করার জন্য এআইয়ের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।’
অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষকও গত বছর বলেছিলেন, দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করলে এআই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল বিষয়ে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। কিন্তু নিজের চিন্তার দায়িত্ব পুরোপুরি এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিলে তা বোকামি হবে।
সূত্র: বিবিসি, স্টোরি বোর্ড ১৮