বয়সে যাঁরা বড় তাঁরা প্রায়ই ছোটদের বলেন, ‘আমাদের সময় লেখাপড়া কত কঠিন ছিল, জানো? তোমাদের এখনকার লেখাপড়া তো অনেক সহজ।’ বাস্তবতা হলো, লেখাপড়া সবার কাছেই কঠিন মনে হয়, যখন সে নিজে লেখাপড়া করে। তবে ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর জরিপ অনুযায়ী, এমন কিছু দেশ রয়েছে যাদের শিক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলক কঠিন। সে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২২তম। আপনি জানেন কি, বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষাব্যবস্থা কোন দেশে?
প্রথমেই বলি, শিক্ষা হলো সুন্দর জীবনের মূল ভিত্তি। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয় শিক্ষাকে। কিন্তু এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানিই আজ বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিষাদময় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চাশা, সামাজিক চাপ, পরীক্ষার নিরন্তর ভীতি এবং নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই শিক্ষার্থীদের শৈশব ও কৈশোরকে এক অসহনীয় চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
১২ ঘণ্টার এক ম্যারাথন প্রস্তুতিতে দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় বড় বাধা হলো সুনেং বা কলেজ স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট। এটি ৮ ঘণ্টার দীর্ঘ পরীক্ষা। এ পরীক্ষাই নির্ধারণ করে একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে। হাইস্কুলের দিনগুলোতে একজন শিক্ষার্থীকে দিনে গড়ে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করতে হয় এ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য। ২০২২ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের স্কুলজীবনে তীব্র মানসিক চাপের শিকার হয়। মজার বিষয় হলো, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি মানসিক চাপে থাকেন। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে কঠিন।
ভারত যেন কোচিং হাব
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম চাপযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলই নির্ধারণ করে দেয় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গতিপথ—বিজ্ঞান, বাণিজ্য নাকি মানবিক। এখানকার কঠিন লড়াই হলো জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামিনেশন, যা মূলত স্টেম বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দেয়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিলেও মাত্র ৫৪ হাজার ৩৭৮ জন অর্থাৎ মাত্র ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী সফল হয়েছেন। এই সাফল্যের খোঁজে অষ্টম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীরা ঘর ছেড়ে ভিড় করে ‘কোচিং হাব’ হয়ে ওঠা শহরগুলোতে।
চীনে গাওকাওয়ের মহালড়াই
চীনে উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গাওকাও পরীক্ষাটি শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। ২০২৫ সালে এই মহালড়াইয়ে নেমেছিলেন ১৩ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন শিক্ষার্থী। প্রদেশভেদে দুই থেকে চার দিন ধরে চলা এই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণার ফল বলছে, প্রায় ৬৪ শতাংশ কলেজশিক্ষার্থী মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভুগছেন, যা গাওকাও পরবর্তী জীবনের দীর্ঘস্থায়ী চাপের দিকেই আঙুল তোলে।
ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর: বিপরীতধর্মী দুই চিত্র
ফিনল্যান্ড তার অ্যান্টি-এক্সাম বা পরীক্ষামুক্ত মডেলের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু সেখানেও মাধ্যমিক শেষে ম্যাট্রিকুলেশন এক্সামিনেশন নামক একটি জাতীয় পরীক্ষা দিতে হয়। কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ২৮ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী উদ্বেগ ও চাপের মধ্য দিয়ে সময় কাটান।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর শেষেই ‘পিএসএলই’ নামক পরীক্ষার মুখোমুখি হন। ২০২৪ সালে প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কঠিন পরীক্ষা ‘জিসিই এ-লেভেল’-এ ৯৪ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্তত তিনটি বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়ে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে ২০২২ সালের একটি গবেষণার ভয়ংকর তথ্য হলো, প্রায় ৯০ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে তীব্র চাপের সম্মুখীন হয়।
তাইওয়ান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ঘুমহীন রাত ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
তাইওয়ানের ‘জিএসএটি’ পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে পাঁচটি মূল বিষয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী তাঁদের শিক্ষাজীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত। এমনকি প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী রাতে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির জন্য এসএটি পরীক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে মাস্টার্স বা ডক্টরাল ডিগ্রির জন্য জিআরই পরীক্ষাকেই সেখানকার কঠিনতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।
সাফল্যের মূল্য যখন শৈশব
গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের মতে, শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট, বিএভি গ্রুপ এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্টন স্কুলের যৌথ জরিপে উঠে এসেছে এক ভিন্ন বৈপরীত্য। যদিও শিক্ষাব্যবস্থার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে থাকে, তবুও গণিত ও বিজ্ঞানে অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় তাদের স্কোর অনেক কম। একটি দেশ যখন উন্নত হয়, তখন তার শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে ঠিকই; কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াইয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘শিক্ষাই বিশ্ব পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।’ কিন্তু সেই অস্ত্র যখন নিজ ধারে শিক্ষার্থীর শৈশব ক্ষতবিক্ষত করে, তখন এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে পুনরায় ভাবার অবকাশ থেকে যায়।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, স্টার্স ইনসাইডার