হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

ডিজনি’স ফলি থেকে স্নো হোয়াইটের বিশ্বজয়ের দিন আজ

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 

পুরো সিনেমাটি হাতে আঁকা হলেও কিছু নির্দিষ্ট সেট এবং চরিত্রের নিখুঁত গঠন ও নড়াচড়া বোঝার জন্য স্টুডিওতে সেগুলোর বাস্তব থ্রিডি মডেল তৈরি করা হয়েছিল। ছবি: গার্ল কালচার ডট কম

অ্যানিমেশনের ইতিহাসে ১৯৩৭ সালের ২১ ডিসেম্বর এক বৈপ্লবিক দিন। লস অ্যাঞ্জেলেসের কার্থে সার্কেল থিয়েটারে সেদিন ওয়াল্ট ডিজনি নির্মিত ‘স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস’-এর প্রিমিয়ার হয়। সেদিন পুরো হলিউড স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এক অনন্য জাদুকরি অভিজ্ঞতায়। এর পরের বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় সিনেমাটি। সব সমালোচনা ভুল প্রমাণ করে সেটি সমালোচক ও দর্শকের মন জয় করে নেয়। প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র হিসেবে ‘স্নো হোয়াইট’ সেদিন রূপকথা থেকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল।

অসাধ্য সাধনের নির্মাণ ইতিহাস

ত্রিশের দশকে যখন এই সিনেমার কাজ শুরু হয়, তখন ওয়াল্ট ডিজনির এই পরিকল্পনাকে খোদ হলিউডই ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল, হাতে আঁকা কার্টুন মানুষ এক ঘণ্টা ধরে দেখবে না। সিনেমার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ডিজনি’স ফলি’ বা ডিজনির বোকামি। কিন্তু দিন শেষে একরাশ অভিনন্দন আর বাহবা নিয়েই ঘরে ফিরেছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি। এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিল। এতে কাজ করেছিলেন ৭৫০ জন শিল্পী। পুরো সিনেমাটি পূর্ণ করতে হাতে আঁকা প্রায় ২০ লাখ পৃথক পেইন্টিং বা স্কেচের প্রয়োজন হয়েছিল। সিনেমাটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার, যা সে সময়ের তুলনায় ছিল আকাশচুম্বী। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, সিনেমা শেষ করার জন্য ওয়াল্ট ডিজনির স্টুডিও প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল।

কারিগরি উদ্ভাবন ও বাস্তববাদ

সিনেমায় গভীরতা বা থ্রিডি আবহ তৈরি করার জন্য ডিজনি ‘মাল্টিপ্লেন ক্যামেরা’ ব্যবহার করেন। এটি অ্যানিমেশনের জগতে ছিল বিপ্লব। স্নো হোয়াইট ও অন্যান্য মানব চরিত্রের নড়াচড়া বাস্তবসম্মত করতে আসল অভিনেতাদের সাহায্য নেওয়া হয়। তাদের অভিনয় রেকর্ড করে তার ওপর ট্র্যাকিং বা ট্রেসিং করে অ্যানিমেশন করা হয়েছিল। এমনকি চরিত্রগুলোর গালের লালচে ভাব এবং ত্বকের জেল্লা ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীরা আসল মেকআপও ব্যবহার করেছিলেন। যদিও ডিজনি এটিকে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। যাতে লোকে একে ‘প্রতারণা’ না বলে! তবে এসব তথ্য কোনো না কোনোভাবে ছড়িয়ে যায়।

পুরো সিনেমাটি হাতে আঁকা হলেও কিছু নির্দিষ্ট সেট এবং চরিত্রের নিখুঁত গঠন ও নড়াচড়া বোঝার জন্য স্টুডিওতে সেগুলোর বাস্তব থ্রিডি মডেল তৈরি করা হয়েছিল। ছবি: সিভিডি হিস্ট্রি অ্যান্ড মিউজিয়াম

অস্কারের ইতিহাসে অনন্য রেকর্ড

১৯৩৮ সালে এই চলচ্চিত্র শ্রেষ্ঠ মিউজিক্যাল স্কোরের জন্য মনোনীত হলেও জয়ী হয়নি। তবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৩৯ সালে একাডেমি ওয়াল্ট ডিজনিকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী শার্লি টেম্পল ডিজনির হাতে একটি বড় অস্কার স্ট্যাচু এবং সাতটি ছোট অস্কার স্ট্যাচু তুলে দেন। এগুলো ছিল তুষারপরী ও সাত বামন চরিত্রের প্রতীক।

কিছু মজার ঘটনা

ওয়াল্ট ডিজনি কিশোর বয়সে ১৯১৬ সালের একটি নির্বাক স্নো হোয়াইট সিনেমা দেখেছিলেন। যেটি তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল। পরে এটিই তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। অ্যানিমেশনের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকা এই কালজয়ী চলচ্চিত্র সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা হয়তো আমাদের অনেকের অজানা। এই ছোট ছোট তথ্যই প্রমাণ করে, কতটা নিখুঁত পরিকল্পনা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছিল আজকের এই কালজয়ী ‘স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস’।

প্রতিটি হাসির খোরাকের জন্য পুরস্কার: স্নো হোয়াইট নির্মাণের সময় অ্যানিমেটরদের উৎসাহ দিতে এক দারুণ পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি। কোনো অ্যানিমেটর যদি কোনো মজার দৃশ্য বা জোকস তৈরি করতে পারতেন, তাহলে তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হতো। প্রতিটি আইডিয়ার জন্য ৫ ডলার পুরস্কার দেওয়া হতো। সেই সময়ে ৫ ডলার ছিল বেশ বড় অঙ্ক।

আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য বিশেষ ড্রয়িং: স্নো হোয়াইট বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাফল্য পায়। আন্তর্জাতিক দর্শকদের কথা বিবেচনায় রেখে অ্যানিমেটররা ড্রয়িংগুলোতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছিলেন। যেসব দৃশ্যে লেখা দেখা যেত, যেমন বামনদের বিছানা বা রানির জাদুর বই, সেগুলো প্রতিটি দেশের স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে পুনরায় আঁকা হয়েছিল, যাতে দর্শকেরা তা বুঝতে পারে।

প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘স্নো হোয়াইট’ এর পোস্টার। ছবি: উইকিপিডিয়া

চুলের জেল্লা বাড়াতে বিশেষ কৌশল: অ্যানিমেশনে স্নো হোয়াইটের চুল অনেকটা নিষ্প্রাণ বা ফ্যাকাশে লাগছিল। এই সমস্যা সমাধানে ‘ইঙ্ক অ্যান্ড পেইন্ট’ বিভাগের নারীরা প্রতিটি ফ্রেমে স্নো হোয়াইটের চুল হাতে এঁকে হাইলাইট বা উজ্জ্বলতা যোগ করেছিলেন। এই প্রক্রিয়া চরিত্রটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

আসল মেকআপের ব্যবহার: স্নো হোয়াইট চরিত্রটিকে আরও বাস্তবসম্মত এবং সুন্দর দেখাতে অ্যানিমেশন সেলের ওপর সরাসরি আসল মেকআপ ব্যবহার করা হয়েছিল। যেমন গালের লালচে আভা বা ব্লাশ; এটি ছিল তখনকার সময়ে এক অভাবনীয় পরীক্ষা।

থ্রিডি মডেলের সাহায্য: পুরো সিনেমাটি হাতে আঁকা হলেও কিছু নির্দিষ্ট সেট এবং চরিত্রের নিখুঁত গঠন ও নড়াচড়া বোঝার জন্য স্টুডিওতে সেগুলোর বাস্তব থ্রিডি মডেল তৈরি করা হয়েছিল। শিল্পীরা সেই মডেলগুলো দেখে নিখুঁতভাবে ছবি আঁকতেন।

সোনালি চুলের স্নো হোয়াইট: আমরা আজ কালো চুলের যে স্নো হোয়াইটকে চিনি, প্রথমে তার চুল কালো ছিল না। একদম শুরুর দিকে তার চুল সোনালি রাখার কথা ভাবা হয়েছিল। পরে তা পরিবর্তন করে কালো করা হয়।

বামনদের বিচিত্র নাম: সাত বামনের নাম ঠিক করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল ডিজনিকে। মজার ব্যাপার হলো, ‘ডোপি’ নাম পাওয়ার আগে দীর্ঘ সময় তাকে শুধু ‘সেভেন্থ’ বা সপ্তম বামন বলে ডাকা হতো। বামনদের জন্য প্রস্তাবিত আরও কিছু নাম ছিল, যেগুলো পরে বাতিল করা হয়। যেমন জাম্পি, বাল্ডি, হিকি, স্নিফি, স্টাফি, শর্টি এবং বার্পি!

বাণিজ্যিক সাফল্য

তৎকালীন বিশ্বজুড়ে এই সিনেমা প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল, যা বর্তমান সময়ের হিসাবে প্রায় ১৭৭ মিলিয়ন ডলারের সমান। এই বিশাল অর্থ দিয়েই ওয়াল্ট ডিজনি ক্যালিফোর্নিয়ার বারব্যাঙ্কে তাঁর বিখ্যাত স্টুডিওটি স্থাপন করেন। ‘স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস’ শুধু একটি কার্টুন ছিল না; এটি ছিল শিল্প ও প্রযুক্তির এক নিখুঁত মেলবন্ধন। আজ ৮৫ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এসে, এটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রগুলোর তালিকার শীর্ষে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এটি প্রমাণ করে দিয়েছিল, কল্পনা যখন কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা রূপকথার মতো সুন্দর এবং বাস্তব হতে পারে।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড প্রেস, হিস্ট্রি ডটকম, দ্য লাইব্রেরি অব কংগ্রেস

একাকিত্বের দুই পিঠ: কখন প্রয়োজন আর কখন এটি বিপজ্জনক

ভার্চুয়াল মডেলে বদলে যাচ্ছে ভিয়েতনামের ফ্যাশন মার্কেটিং

সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলবেন যেসব কারণে

আজকের রাশিফল: সুন্দরীর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেখেই অস্থির হবেন না, বাজারের ব্যাগটা আপনাকেই টানতে হবে

জানেন কি, মোবাইল ফোন স্ক্রলিং ক্লান্ত করে দেয় শরীর ও মন

আপনার সন্তান কি পেট ভরে খেয়েও অপুষ্টিতে ভুগছে

আজকের রাশিফল: ঘটকের পাল্লায় পড়বেন, লজিকে জিতলেও শান্তিতে হারবেন

শিশুকে টয়লেট ট্রেনিং দেবেন যেভাবে

বিয়ের পর পুরুষের তুলনায় অসন্তুষ্ট থাকেন নারীরা

আজকের রাশিফল: ফেসবুকে ‘নাইজেরিয়ান রাজপুত্র’ মেসেজ পাঠাতে পারে—সাবধান, বিবাদ মিটে যাবে