সুন্দর, ঘন ও মজবুত চুলের আকাঙ্ক্ষা কমবেশি সবারই থাকে। তবে দৈনন্দিন জীবনের নানা ভুল অভ্যাস, মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অপর্যাপ্ত পরিচর্যার কারণে অনেকেই চুল পড়া এবং ভেঙে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন।
চিকিৎসকদের মতে, একজন মানুষের মাথার ত্বকে জন্মগতভাবেই নির্দিষ্টসংখ্যক চুলের ফলিকল থাকে। সাধারণত এর সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজারের মধ্যে। ফলিকল হলো ত্বকের নিচে অবস্থিত ক্ষুদ্র থলি, যেখান থেকে চুল গজায়। ফলিকলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে চুল প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পায়, যা চুলের বৃদ্ধি ও সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। তবে এর চেয়ে বেশি চুল পড়া, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা সহজে ভেঙে যাওয়ার পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্য, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মতো নানা কারণ থাকতে পারে।
চুলের বৃদ্ধি ও সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন এনে চুলের ভাঙন কমানো ও চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করা সম্ভব।
চুল দ্রুত লম্বা ও মজবুত করতে নিচে ১৪টি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লিন্ডসে বোর্ডোন জানান, কঠোর ডায়েট নিয়ন্ত্রণে রাখা চুলের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের শরীর যখন পুষ্টির অভাবে মানসিক বা শারীরিক চাপে পড়ে, তখন শরীর তার শক্তির সঞ্চয় বজায় রাখতে চুলের বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে। হঠাৎ করে ওজন কমানোর ফলেও সাময়িকভাবে অতিরিক্ত চুল ঝরতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘টেলোজেন ইফ্লুভিয়াম’ বলা হয়।
চুল মূলত প্রোটিন দিয়ে গঠিত। খাবার তালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে চুল পড়া বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা দৈনিক অন্তত ৫০ গ্রাম বা তার বেশি প্রোটিন গ্রহণের পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ভালো মানের প্রোটিন পাউডার বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
ক্যাফেইন শুধু ক্লান্তি দূর করতেই নয়, চুলের বৃদ্ধিতেও সমান কার্যকর। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইনযুক্ত শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার ব্যবহারে মাথার ত্বকের কোষের উদ্দীপনা বাড়ে, যা ওষুধভিত্তিক চিকিৎসার মতোই কার্যকরভাবে চুল পড়া প্রতিরোধ করতে পারে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক এসেনশিয়াল অয়েল চুলের বৃদ্ধিতে দুর্দান্ত কাজ করে। বিশেষ করে পাম্পকিন সিড অয়েল (মিষ্টিকুমড়ার বিচির তেল), রোজমেরি অয়েল, পেপারমিন্ট অয়েল, জোজোবা ও ল্যাভেন্ডার তেল চুলের গোড়া মজবুত করতে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।
শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব হলে চুলের গঠনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আয়রন, জিংক, ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ডি, ই, এ এবং ফোলিক অ্যাসিডের ঘাটতি চুল পড়ার প্রধান কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ সাপ্লিমেন্ট চুল পড়া কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাথার ত্বক প্রতিদিন আঙুল দিয়ে ম্যাসাজ করলে রক্তের কৈশিক নালিগুলো প্রসারিত হয়। এতে স্ক্যাল্পে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যা চুলকে মূল থেকে শক্ত ও মোটা করে তোলে। ফলে চুল সহজে ভেঙে যায় না।
চুলের আধুনিক চিকিৎসায় প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা বা পিআরপি থেরাপি একটি বিপ্লব নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, রোগীর নিজের রক্ত থেকে প্লাটিলেট নিয়ে স্ক্যাল্পে ইনজেক্ট করা হয়, যা স্টেম সেলের মতো কাজ করে চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।
কার্লিং আয়রন, স্ট্রেটনার বা হেয়ার ড্রায়ারের অতিরিক্ত ব্যবহার চুলের আর্দ্রতা নষ্ট করে দেয় এবং চুলকে শুষ্ক করে ভেঙে ফেলে। স্টাইলিং টুলস ব্যবহারের সময় তাপমাত্রা কম রাখা উচিত এবং হিট প্রটেক্ট্যান্ট স্প্রে ব্যবহার করা জরুরি।
চুল পড়া বন্ধ করতে ও নতুন চুল গজাতে মিনোক্সিডিল একটি বহুল ব্যবহৃত ওষুধ। এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, কারণ কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে ১২ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
চুলে স্থায়ী হেয়ার ডাই বা কেমিক্যালযুক্ত রং ব্যবহারে চুলের প্রাকৃতিক ফ্যাটি অ্যাসিড নষ্ট হয়ে যায়। এতে চুল পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই কেমিক্যালযুক্ত রং এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত শ্যাম্পু বা লিভ-ইন স্ক্যাল্প ট্রিটমেন্ট স্ক্যাল্পের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করে। এটি মাথার ত্বককে সুস্থ রাখে এবং চুল পাতলা হওয়া প্রতিরোধ করে।
কয়েক মাস পরপর চুলের আগা ছেঁটে বা ট্রিম করে নিলে স্প্লিট এন্ডস (চুলের মুখ ফেটে যাওয়া) সমস্যা দূর হয়। তবে এটি সরাসরি চুল দ্রুত লম্বা করে না—কারণ, চুল প্রতি মাসে গড়ে মাত্র আধা ইঞ্চি পরিমাণ বাড়ে। ট্রিম করলে চুলের আগা ভাঙা বন্ধ হয়, ফলে চুল দেখতে ঘন ও সুস্থ লাগে।
প্রতি রাতে ৭-৯ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুমানো প্রয়োজন, যা মেলাটোনিন হরমোন (ঘুমের হরমোন) নিঃসরণে সাহায্য করে। সুতি কাপড়ের বদলে রেশম (সিল্ক) বা স্যাটিনের বালিশের কভার ব্যবহার করুন, যা চুলের ঘর্ষণ কমায়। ভেজা চুলে কখনোই ঘুমাতে যাওয়া উচিত নয়, কারণ, ভেজা অবস্থায় চুলের গোড়া নরম ও ভঙ্গুর থাকে।
দীর্ঘস্থায়ী বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে চুল ‘রেস্টিং ফেজ’-এ (এমন একটি বিশ্রাম বা সুপ্ত পর্যায়, যখন চুলের ফলিকলগুলো নতুন চুল না বাড়িয়ে বরং বিশ্রামে থাকে) চলে যায়, যার ফলে নতুন চুল গজানোর বদলে দ্রুত ঝরতে শুরু করে। মানসিক চাপ কমাতে প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম, মেডিটেশন ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
চুল রাতারাতি লম্বা করার কোনো অলৌকিক উপায় নেই। তবে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভালো ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং চুলের সঠিক পরিচর্যা চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারে। চুল পড়া বেশি হলে বা দীর্ঘদিন চুলের বৃদ্ধি না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তথ্যসূত্র: হেলথলাইন